চার বছর বয়সি ছোট্ট আকিরা হায়দার আরশির শেষ কথাগুলো এখনো কানে বাজে তার বাবা আল আমিনের। মৃত্যুর আগে বাবাকে দেখেই কাঁপা কণ্ঠে বলেছিল, বাবা, আমাকে বুকে নাও… পানি দাও। কিন্তু চিকিৎসকের নিষেধে মেয়েকে ছুঁতেও পারেননি, পানিও দিতে পারেননি তিনি। সেই অসহায় মুহূর্তটাই হয়ে রইল বাবা-মেয়ের শেষ দেখা।
রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত একটি শিশু হাসপাতালে গত ১ এপ্রিল নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) এই শেষ কথোপকথন হয়। লাইফ সাপোর্টে থাকা আকিরাকে পরদিন রাতেই মৃত ঘোষণা করা হয়। মৃত্যুসনদে উল্লেখ করা হয় হাম, শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা, সারা শরীরে সংক্রমণ এবং সম্ভাব্য জন্মগত হৃদরোগে তার মৃত্যুর কারণ।
আল আমিন জানান, প্রায় এক মাস ধরে বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে মেয়েকে নিয়ে। নিউমোনিয়া, জ্বর ও পরবর্তীতে হামসহ নানা জটিলতায় মোট পাঁচবার হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। কখনো অক্সিজেনের অভাব, কখনো পিআইসিইউ না থাকায় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে তাকে।
মিরপুরের টোলারবাগে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন আল আমিন। স্ত্রী, মেয়ে আকিরা এবং ছোট ছেলে আদিয়ানকে নিয়ে ছিল তার সংসার। আকিরা ছিল দুই পরিবারের প্রথম নাতনি সবাইয়ের খুব আদরের। এখন সেই ঘরজুড়ে শুধু তার স্মৃতি।
মেয়ের খেলনা, জামাকাপড়, পুতুল, মেকআপ বক্স সবকিছু আগের মতোই পড়ে আছে। হাসপাতালে বসেই খেলনা চেয়েছিল আকিরা। বাবা তার জন্য স্টেথোস্কোপ, গোলাপি মোটরবাইক আর গিটার কিনে দিয়েছিলেন। অসুস্থ অবস্থাতেও সেগুলো নিয়ে খেলেছিল সে। এখন সেই স্মৃতিগুলোই বাবার চোখে জল আনে।
ঈদের জন্য কেনা নতুন জামাটিও আর পরা হয়নি। ভিডিও কলে নিজেই পছন্দ করেছিল জামাটি। কিন্তু ঈদের দিনও তাকে কাটাতে হয়েছে হাসপাতালের বিছানায়।
আল আমিন বলেন, মার্চের শুরুতে হালকা জ্বর-কাশি দিয়েই অসুস্থতা শুরু হয়। পরে তা নিউমোনিয়ায় রূপ নেয়। একপর্যায়ে শ্বাসকষ্ট, শরীরে র্যাশ, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, মুখে ঘা— সব মিলিয়ে অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে। শেষদিকে জানা যায়, সে হামেও আক্রান্ত হয়েছিল।
চিকিৎসার পেছনে তিন লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। নিজের সঞ্চয়, অফিসের সহায়তা, আত্মীয়স্বজন—সব মিলিয়ে চেষ্টা করেছেন সর্বোচ্চ। তবু মেয়েকে বাঁচাতে পারেননি।
কষ্টভরা কণ্ঠে তিনি বলেন, চেষ্টা করেছি সবকিছু। আরও টাকা লাগলে দিতাম। শুধু চেয়েছিলাম মেয়েটা বেঁচে থাকুক। পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে আমার মেয়েই ছিল বড়।
একটি বড় আফসোসও রয়েছে তার আকিরাকে নিয়মিত টিকা দেওয়া হলেও হাম প্রতিরোধের টিকা দেওয়া হয়নি। তিনি মনে করেন, এটি বড় ভুল ছিল। এখন অন্য অভিভাবকদের প্রতি তার অনুরোধ, টিকার ব্যাপারে যেন কোনো অবহেলা না করা হয়।
মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানোর প্রস্তুতিও শুরু করেছিলেন তিনি। কিনেছিলেন ছোট্ট হলুদ রঙের স্কুলব্যাগ। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
এখন আল আমিনের একটাই প্রত্যাশা চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি হোক, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত থাকুক, যেন আর কোনো বাবা-মাকে সন্তানের জন্য এভাবে দৌড়াতে না হয়। আর কোনো পরিবার যেন এমন শূন্যতার মুখোমুখি না হয়।


