আপনার সঙ্গী কি নিয়মিত কোনো সহকর্মীর পোস্টে ‘লাইক’ দিচ্ছেন? কিংবা আপনি জানেন না এমন ব্যক্তিগত কথা অফিসের এক বন্ধুর সঙ্গে শেয়ার করছে? এগুলো কি নিছক বন্ধুত্ব, নাকি সম্পর্কের সীমা অতিক্রম করার ইঙ্গিত।
আমরা সাধারণত সম্পর্কে প্রতারণা বলতে বড় ধরনের শারীরিক বা আবেগগত বিশ্বাসঘাতকতাকেই বুঝে থাকি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, শুরুতে নির্দোষ মনে হওয়া কিছু ছোট আচরণের মধ্যেই ভবিষ্যৎ বড় সমস্যার বীজ লুকিয়ে থাকতে পারে। এ ধরনের সূক্ষ্ম আচরণগুলোকেই বলা হয় ‘মাইক্রো-চিটিং’।
মাইক্রো-চিটিং আসলে কী
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও কাপল থেরাপি স্পেশালিষ্ট মলি বুরেটস বলছেন, মাইক্রো-চিটিং হলো এমন ছোট আচরণ, যেগুলো স্পষ্টভাবে ধরা যায় না, কিন্তু এগুলো সম্পর্কের সীমা ভাঙার ইঙ্গিত দেয়। এর মধ্যে থাকতে পারে সোশ্যাল মিডিয়ায় বারবার আকর্ষণীয় মানুষদের ছবি লাইক বা ফলো করা কিংবা কাউকে নিয়মিত ব্যক্তিগত অনুভূতি বা গোপন কথা বলা। অথবা কর্মস্থলে বা পরিচিত কারো সঙ্গে অতিরিক্ত ফ্লার্ট করা বা সঙ্গীর অজান্তে কাউকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। এসব আচরণে হয়তো সরাসরি কোনো শারীরিক সম্পর্ক নেই, কিন্তু আবেগের জায়গায় একটি ফাঁক তৈরি হতে শুরু করে।
মানুষ কেন মাইক্রো-চিটিং করে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে এবং অনেক সময় মানুষ নিজেও তা বুঝতে পারে না।
মলি বুরেটস বলেন, যারা সম্পর্কে বারবার সীমা ঠেলে দেয় এবং এর কোনো ফল ভোগ করে না, তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই মাইক্রো-চিটিং করতে পারে। আবার কেউ কেউ নিজের সম্পর্কেই অপূর্ণতা অনুভব করেন। ভালোবাসা, প্রশংসা বা মনোযোগের ঘাটতি অন্য জায়গা থেকে পূরণ করার চেষ্টা করেন অচেতনভাবেই।
রিলেশনশিপ এক্সপার্ট ও মনোবিজ্ঞানী ওয়েন্ডি ওয়ালশ বিষয়টিকে আরও গভীরে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, মানুষ অবচেতনভাবে সব সময় একটি বিকল্প (ব্যাকআপ) সম্পর্কের ধারণা মাথায় রাখে যদি বর্তমান সম্পর্কে কিছু ঘটে, তাহলে কার কাছে যাবে।
এতে সম্পর্কের কী ক্ষতি হয়
মাইক্রো-চিটিংয়ের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় বিশ্বাসের জায়গায়। বুরেটস বলেন, নতুন মানুষের কাছ থেকে পাওয়া মনোযোগ আমাদের ডোপামিন বাড়ায়। নতুনত্বের কারণে সেটা আরও আকর্ষণীয় লাগে। কিন্তু শক্তি যদি বাইরের দিকে চলে যায়, তাহলে নিজের সম্পর্ক অবহেলিত হয়। কিছু মানুষের কাছে ফ্লার্টিং তেমন বড় বিষয় নয়। কিন্তু অন্যদের জন্য এটি হতে পারে বড় মানসিক আঘাত।
ওয়ালশ সতর্ক করে বলেন, একজন সঙ্গী যদি নিজেকে অনিরাপদ মনে করেন, তাহলে সম্পর্কের ভেতর ভয়, সন্দেহ ও প্রতিরক্ষা তৈরি হয়। দীর্ঘদিন চললে তা বিশ্বাস ও নিরাপত্তা দুটোই নষ্ট করে দেয়।
যেভাবে মাইক্রো-চিটিং এড়ানো যায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো খোলামেলা কথা বলা। সম্পর্কের শুরুতেই সীমা নিয়ে আলোচনা করা দরকার।
প্রশ্ন হতে পারে—
- আমাদের কাছে সীমার অর্থ কী?
- সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য?
- অন্য কারো সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠ হওয়া ঠিক?
- যদি সন্দেহ হয়, তখন কী করবেন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগের সুর নয় কৌতূহল ও নিজের অনুভূতির ভাষায় কথা বলা জরুরি।
ওয়ালশ উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘তুমি এটা করছ কেন?’ বলার বদলে বলা যায় ‘তুমি যখন ওই ছবিগুলো লাইক করো, তখন আমার ভেতরে অনিরাপত্তা তৈরি হয়। এতে বুঝি আমি তোমাকে কতটা গুরুত্ব দিই। মনে রাখতে হবে নীরবতাকে অনেক সময় অনুমতি হিসেবেই ধরা হয় তাই সম্পর্ক নিয়ে সচেতন থাকতে হবে।
মাইক্রো-চিটিং হয়তো ছোট আচরণ, কিন্তু এর প্রভাব বড়। এটি সরাসরি প্রতারণা নাও হতে পারে, তবে অবহেলা করলে ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভিত নড়বড়ে করে দিতে পারে। সচেতনতা, স্পষ্ট সীমা ও নিয়মিত যোগাযোগই পারে এই নীরব দূরত্ব ঠেকাতে।



