বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়াকে সাধারণত স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে ধরা হয়। তবে শুধু বয়স বা শারীরিক অসুস্থতাই নয়, দীর্ঘদিনের একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও হৃদস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে জানিয়েছে সাম্প্রতিক গবেষণা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক প্রবীণ ব্যক্তি শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকতে পারেন না। ফলে তারা দীর্ঘ সময় একা থাকেন, যা ধীরে ধীরে তাদের হৃদযন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৫ সালে সোশ্যাল সাইন্স অ্যান্ড মেডিসিন জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় একাকিত্ব এবং করোনারি হৃদরোগের ঝুঁকির মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা দুটি আলাদা অবস্থা হলেও দুটিই হৃদরোগজনিত জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্বকে করোনারি ধমনিতে ব্লকেজ তৈরির অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দীর্ঘ সময় সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকলে শরীরে স্থায়ী মানসিক চাপ তৈরি হয়। এর ফলে শরীর সব সময় সতর্ক বা ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়ার মতো অবস্থায় থাকে। এতে রক্তচাপ বেড়ে যায়, রক্তনালীর ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং শরীরে প্রদাহের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। সময়ের সঙ্গে এসব পরিবর্তন হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সাইন্টিফিক রিপোর্টস প্রকাশিত আরেকটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ একাকিত্ব অনুভব করেন। অন্যদিকে, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রতি চারজনের একজন সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সমস্যায় ভুগছেন। বিভিন্ন গবেষণার সম্মিলিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হৃদরোগের ঝুঁকি প্রায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একাকিত্বের কিছু লক্ষণ আগে থেকেই চিহ্নিত করা গেলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। একা থাকা ব্যক্তিরা প্রায়ই নিজের যত্ন নেওয়ার প্রতি অনীহা দেখান, জীবনযাপন হয়ে পড়ে অনিয়মিত, খাবার ও ঘুমের সময়সূচি এলোমেলো হয়ে যায়। পাশাপাশি তারা সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলেন, মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেন এবং ধীরে ধীরে অনিদ্রা, মনোযোগের ঘাটতি, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া ও মানসিক ক্লান্তির মতো সমস্যায় ভুগতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বিশেষ করে প্রবীণদের মানসিক সুস্থতার পাশাপাশি সামাজিক সংযোগ বজায় রাখাও হৃদস্বাস্থ্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা সমাজের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ একাকিত্ব কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাসে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

