আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারসহ সকল নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে এবং চলবে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রশিক্ষণে ৮ লাখের বেশি কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করবেন, যা দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম নির্বাচনী প্রশিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনের প্রশিক্ষণ গত তিনটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে পরিকল্পিত। এবার বিশেষভাবে নতুন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। যেহেতু নতুন কর্মকর্তাদের নির্বাচনী ধারণা কম, তাই তাদের জন্য প্রশিক্ষণকে আরও ইনডেপথ ও বিস্তৃত করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই প্রিজাইডিং অফিসার ভোটকেন্দ্রে যেন ‘চিফ ইলেকশন কমিশনার’ হিসেবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারে। এজন্য আমরা তাদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণও দেব।’
প্রশিক্ষণ কার্যক্রম তিনটি পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ধাপে সিনিয়র কর্মকর্তাদের ‘কোর প্রশিক্ষণ’ দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ধাপে টিওটি (Training of Trainers) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এবং তৃতীয় ধাপে প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের মূল নির্বাচনী প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রশিক্ষণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, প্রোগ্রামার, আনসার এবং অন্যান্য নির্বাচনী কর্মকর্তারাও অংশ নেবেন।
ইসি জানিয়েছে, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে মোট তিনটি অংশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রথমে নির্বাচন আইন ও বিধি-বিধান সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হবে। দ্বিতীয় অংশে ভোটগ্রহণ ও গণনার প্রক্রিয়া, ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব, ভোটযন্ত্র ও সরঞ্জামের ব্যবস্থাপনা এবং সমস্যার সমাধান শেখানো হবে। তৃতীয় অংশ হবে মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম, যাতে কর্মকর্তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং ভোট কেন্দ্রের বাস্তব সমস্যা মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকে।
মহাপরিচালক এস এম আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রিজাইডিং অফিসাররা ভোটকেন্দ্রে কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন, তা হাইপোথেটিক্যাল উদাহরণসহ বিশ্লেষণ করা হবে। অতীত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জগুলোর আলোকে কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হবে।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। যারা এতে দায়িত্বে থাকবে তারা যদি প্রপার ট্রেনিংপ্রাপ্ত না হয়, তাহলে নির্বাচনে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই আমাদের লক্ষ্য হলো ন্যূনতম বিচ্যুতি এবং সম্পূর্ণ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন।’
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের আওতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তাদেরও বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের প্রশিক্ষণ/ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হবে। নির্বাচন ঘোষণার পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে অনলাইন ব্রিফিং এবং জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের ভোটগ্রহণের আগে ও পরে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
টিওটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ সিনিয়র কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যারা পরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেবেন। এছাড়া টেকনিক্যাল বিষয়ক প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে। দেশের বিভিন্ন জেলায় কর্মরত প্রোগ্রামার এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রামাররা প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের মূল নির্বাচনী কার্যক্রমে দক্ষ করে তুলবেন।
নির্বাচন কমিশন আরও জানিয়েছে, নির্বাচনের পুরো প্রশিক্ষণ কার্যক্রম প্রায় চার মাস ধরে চলবে। গত ২৯ আগস্ট থেকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং নির্বাচনের চার-পাঁচ দিন আগে শেষ হবে। এ প্রশিক্ষণ পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক করতে একটি বড় ভূমিকা রাখবে।
এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনে যারা দায়িত্বে থাকবে, তারা যদি যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না হয়, তাহলে ভোটগ্রহণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমরা চাই প্রতিটি কর্মকর্তা তার কাজ যথাযথভাবে, আইন ও বিধি অনুযায়ী, সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করুক। এই উদ্দেশ্যেই আমাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।’
নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ অনুযায়ী, প্রার্থিতা চূড়ান্তকরণ, প্রতীক বরাদ্দ, নির্বাচনী প্রচারণা এবং ভোটগ্রহণের সময়সূচি ঠিক করা হয়েছে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি এবং চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।
নির্বাচনের সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ইসি’র জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মকর্তারা ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে।




