ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

দ্বিতীয় বিয়ের আগে যে ৭ বিষয় জানা জরুরি

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬, ০৬:১২ পিএম
প্রতীকী ছবি

ইসলামি শরিয়তে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে একজন মুসলিম পুরুষকে একই সময়ে সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী পর্যন্ত রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই অনুমতি শর্তহীন নয়। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, দায়িত্ববোধ এবং প্রত্যেক স্ত্রীর অধিকার যথাযথভাবে আদায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তাই দ্বিতীয় বা একাধিক বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিচের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

১. আর্থিক ও দাম্পত্য সক্ষমতা

একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে প্রত্যেক স্ত্রীর ভরণপোষণ, বাসস্থান, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার বহনের আর্থিক সক্ষমতা থাকতে হবে। একইসঙ্গে দাম্পত্য অধিকার আদায় এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাও জরুরি।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘পুরুষরা নারীদের অভিভাবক; কারণ আল্লাহ তাদের একদলকে অন্যদলের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন এবং তারা তাদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা নিসা: ৩৪)

এ ছাড়া হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের (দায়িত্ব) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে... একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল।’ (সহিহ বুখারি: ৮৯৩; সহিহ মুসলিম: ১৮২৯)

তাই এসব দায়িত্ব পালনে অক্ষম ব্যক্তির জন্য একাধিক বিয়ে করা সমীচীন নয়।

২. স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা

একাধিক বিয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ন্যায়বিচার। ভরণপোষণ, সময় বণ্টন, বাসস্থান এবং বাহ্যিক আচরণের ক্ষেত্রে সব স্ত্রীর অধিকার সমানভাবে রক্ষা করা ওয়াজিব।

এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুইজন স্ত্রী থাকা অবস্থায় তাদের একজনের প্রতি ঝুঁকে পড়লো, কেয়ামতের দিন সে পঙ্গু অবস্থায় উপস্থিত হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২১৩৩)

৩. ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে একটিতেই সীমাবদ্ধ থাকা

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, তোমরা সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে একজনকে কিংবা তোমাদের অধীনস্থ দাসীকে; এটাই হবে অবিচার না করার কাছাকাছি।’ (সুরা নিসা: ৩)

অর্থাৎ, ন্যায়বিচার করতে না পারার বাস্তব আশঙ্কা থাকলে একাধিক বিয়ার পরিবর্তে একটি বিয়েতেই সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন, ‘তোমরা যতই ইচ্ছা করো না কেন, স্ত্রীদের মধ্যে (অন্তরের ভালোবাসার ক্ষেত্রে) পুরোপুরি সমতা স্থাপন করতে কখনোই সক্ষম হবে না।’ (সুরা নিসা: ১২৯)

তাফসিরকারদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এখানে মানুষের অন্তরের ভালোবাসার পূর্ণ সমতা সম্ভব নয়—সেই বাস্তবতার কথা বলা হয়েছে। তবে ভরণপোষণ, সময় বণ্টন, বাসস্থান এবং অন্যান্য অধিকারের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার করা অবশ্যই আবশ্যক।

৪. প্রত্যেক স্ত্রীর স্বতন্ত্র বাসস্থানের অধিকার

ফিকহবিদদের মতে, স্ত্রীরা যদি একসঙ্গে বসবাসে সম্মত না হন, তবে প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য এমন পৃথক বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব, যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন নিশ্চিত থাকে। (আল-হিদায়া; রদ্দুল মুহতার) পারস্পরিক সম্মতিতে একই বাসস্থানে থাকার সিদ্ধান্ত হলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে।

৫. প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে সততা ও উত্তম আচরণ

কোরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতার জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি শরয়ি শর্ত নয়। তবে স্ত্রীকে গোপন রেখে, প্রতারণার মাধ্যমে বা অযথা কষ্ট দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ইসলামের নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ (জামে তিরমিজি: ৩৮৯৫)

তাই পারিবারিক সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে স্ত্রীকে অবহিত করা এবং তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করাকে আলেমরা উত্তম আচরণের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

৬. দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতির সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া

ইসলামে একাধিক বিয়েকে কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা প্রবৃত্তি পূরণের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। সুরা নিসার শুরুতেই এতিমদের অধিকার ও ন্যায়বিচারের আলোচনা এসেছে, এরপরই একাধিক বিয়ের অনুমতির কথা বলা হয়েছে।

নবীজি (স.)-এর যুগসহ ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক ও মানবিক প্রেক্ষাপটে একাধিক বিয়ের নজির পাওয়া যায়। তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দায়িত্ববোধ, ন্যায়বিচার এবং আল্লাহভীতিকে প্রাধান্য দেওয়া একজন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য।

৭. রাষ্ট্রীয় আইন মেনে চলা

শরয়ি বিধানের পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় আইন মেনে চলাও দায়িত্বের অংশ। বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি গ্রহণসহ কিছু আইনি বিধান রয়েছে। তাই ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রচলিত রাষ্ট্রীয় আইনও অনুসরণ করা উচিত।

সুতরাং একাধিক বিয়ের অনুমতিকে কেবল একটি অধিকার হিসেবে নয়, বরং একটি বড় আমানত, দায়িত্ব এবং জবাবদিহির বিষয় হিসেবে দেখা উচিত। যদি ন্যায়বিচার, ভরণপোষণ এবং প্রত্যেকের অধিকার যথাযথভাবে আদায়ের সক্ষমতা ও মানসিক প্রস্তুতি না থাকে, তবে একটি বিয়েতেই সীমাবদ্ধ থাকাই কোরআনের নির্দেশনার অধিক নিকটবর্তী এবং দুনিয়া ও আখেরাত উভয় দিক থেকেই নিরাপদ।