আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের সব ধরনের চ্যালেঞ্জ নিতে সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা এবং আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে এবারের নির্বাচনকে ভবিষ্যতের জন্য একটি আদর্শ ও দৃষ্টান্তমূলক নির্বাচনে রূপ দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নির্বাচন সামনে রেখে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর আয়োজিত গণভোটকে ঘিরে এই বৈঠকে সরকার, নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সরকারের মূল দায়িত্ব হলো নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা এবং তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী সব সংস্থাকে একযোগে কাজ করতে উৎসাহিত করা। তিনি বলেন, নির্বাচন জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং এই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারলে এটি দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। নির্বাচনের দিন যেন কোথাও কোনো ধরনের ঘাটতি বা বিশৃঙ্খলা না থাকে সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেন তিনি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন যেন ভবিষ্যতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনের জন্য একটি আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়, সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার কাজ করছে। তিনি জানান, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ধাপে ধাপে প্রস্তুতির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারি হবে এই প্রস্তুতির চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই পুরো সময়জুড়ে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশই হবে সর্বোচ্চ নির্দেশ এবং সব বাহিনী ও প্রশাসনিক সংস্থাকে তা অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমান্ডের মূল ভূমিকায় থাকবে। তবে এবারের নির্বাচনে প্রচলিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও যুক্ত হয়েছে, যা মোকাবিলায় সরকার আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তিনি জানান, নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে, ভোটকেন্দ্রগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে এবং একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থেকে সারা দেশের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে।
ড. ইউনূস বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও প্রশাসনের মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয়ের ঘাটতি থাকা চলবে না। সামান্য অবহেলাও পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচন দেশি ও বিদেশি বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক কভার করবেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। তাই সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
বৈঠকে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জানান, নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ২৬টি দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৩০০ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তাদের ৫৬ জন প্রতিনিধি দেশে অবস্থান করছেন এবং মনোনয়নপত্র সংক্রান্ত আপিল প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি জানান, প্রার্থীরা আজ মধ্যরাত থেকে শুরু করে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে পারবেন।
ইসি সচিব আরও বলেন, এবারের নির্বাচনে সাইবার স্পেসে তথ্য বিকৃতি ও গুজব একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। দলীয় প্রতীকের ব্যালট, গণভোটের ব্যালট এবং পোস্টাল ব্যালট—এই তিন ধরনের ব্যালট গণনার কারণে ফল প্রকাশে কিছুটা সময় লাগতে পারে। এই সময়কে ঘিরে অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা প্রতিরোধে গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, নির্বাচনের দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, দেশের সব ভোটকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বৈঠকে জানান, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে এবং নির্বাচনের সময় জনমনে স্বস্তি নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলো পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র আনসার সদস্যরা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান করবেন। এর ফলে কেউ চাইলে বেআইনি উপায়ে ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ বিঘ্নিত করতে পারবে না।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় প্রবেশ করতে পারবেন। স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গণি জানান, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে বডি ক্যামেরা সরবরাহ সম্পন্ন হবে। ভোটের চার দিন আগে সব বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে এবং ভোটের পর আরও সাত দিন তারা মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে প্রয়োজনে ড্রোন ব্যবহার করা হবে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একাধিক টিম সার্বক্ষণিক মনিটরিং কার্যক্রম চালাবে।
বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বডি ক্যামেরা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। এসব প্রযুক্তি যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। তিনি জানান, নির্বাচন পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে এবং প্রয়োজনে আরও ঘন ঘন এ ধরনের সমন্বয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যাতে যেকোনো সমস্যা দ্রুত সমাধান করা যায় এবং জাতিকে একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হয়।




