ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ভোটের দিন যা যা করতে পারবেন না নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্তরা

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৫:০০ পিএম
ছবি- সংগৃহীত

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন জনমতের প্রতিফলন এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রধান মাধ্যম। এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসাররা। তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং এটি একটি পবিত্র জাতীয় আমানত।

একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার পুরো বিষয়টি নির্ভর করে এই কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব, সততা এবং নিরপেক্ষতার ওপর। তাই নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

কর্মকর্তাদের সামান্য ব্যক্তিগত পছন্দ বা অসতর্কতা পুরো নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে পারে। তাই নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং নির্বাচনি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে তাদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট কাজ ‘কঠোরভাবে নিষিদ্ধ’ করা হয়েছে, যা নিচে আলোচনা করা হলো:

১. পক্ষপাতমূলক আচরণ বা প্রচার

  • রাজনৈতিক আনুগত্য প্রকাশ: কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থী বা প্রতীকের পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলা বা ইশারা দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • প্রার্থীকে সহায়তা: কোনো ভোটারকে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে প্রভাবিত করা বা সহায়তা করা যাবে না।

২. ভোটকেন্দ্রের শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তা ভঙ্গ

  • গোপন কক্ষে প্রবেশ: ভোটার যখন ভোট দিচ্ছেন, তখন কোনো কর্মকর্তা (প্রিসাইডিং বা পোলিং) গোপন কক্ষে প্রবেশ করতে পারবেন না। তবে যান্ত্রিক ত্রুটি বা বিশেষ প্রয়োজনে সবার উপস্থিতিতে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
  • ভোটের গোপনীয়তা ফাঁস: কোনো ভোটার কাকে ভোট দিয়েছেন তা জানার চেষ্টা করা বা কাউকে জানিয়ে দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।

৩. অনিয়ম ও অবৈধ হস্তক্ষেপ

  • ব্যালট পেপারে হস্তক্ষেপ: কোনো কর্মকর্তা নিজের ইচ্ছেমতো ব্যালট পেপারে সিল মেরে ভোট প্রদান করতে পারবেন না।
  • অননুমোদিত ব্যক্তিকে সুযোগ দেওয়া: পোলিং এজেন্ট বা নির্ধারিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কাউকে ভোটকেন্দ্রের ভেতর অবস্থান করতে দেওয়া যাবে না। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও প্রিসাইডিং অফিসারের অনুমতি ছাড়া ভোটকক্ষে অবস্থান করতে পারেন না।

৪. সরঞ্জাম ও তথ্যের অপব্যবহার

  • বেআইনিভাবে ব্যালট হস্তান্তর: সরকারি নিয়ম ও সময়সীমার বাইরে কাউকে ব্যালট পেপার বা নির্বাচনী সরঞ্জাম দেওয়া যাবে না।
  • ভুয়া ফলাফল তৈরি: ভোটের প্রকৃত সংখ্যা গোপন করে কোনো জাল রেজাল্ট শিট বা বিবরণী তৈরি করা যাবে না।

৫. ভোটারের অধিকার ও পরিচয় যাচাইসংক্রান্ত

  • পরিচয় যাচাইয়ে অবহেলা: ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে তাকে ব্যালট পেপার দেওয়া যাবে না। তবে বৈধ ভোটারকে অযথা হয়রানি করা বা ভোট দিতে বাধা দেওয়াও বড় অপরাধ।
  • ভুল কালি ব্যবহার: অমোচনীয় কালির পরিবর্তে সাধারণ কালি ব্যবহার করা যাবে না। কালি লাগানোর ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি করা যাবে না কারণ এটি জাল ভোট প্রতিরোধের প্রধান অস্ত্র।
  • ভোটারকে প্ররোচিত করা: ‘অমুক মার্কায় ভোট দিন’ বা ‘অমুক মার্কায় ভোট দেওয়া সহজ’—এমন কোনো কথা বা পরামর্শ ভোটারকে দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

৬. ভোটকক্ষ ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা

  • এজেন্টদের সাথে অন্যায্য আচরণ: বৈধ নিয়োগপত্র থাকা কোনো পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া যাবে না। আবার কোনো এজেন্টের অন্যায় আবদারও মানা যাবে না।
  • বাইরের প্রভাব: স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতাদের ভোটকক্ষে বসে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
  • ভোটের সময় পরিবর্তন: নির্ধারিত সময়ের আগে ভোটগ্রহণ শুরু করা বা কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া নির্ধারিত সময়ের আগে ভোটগ্রহণ বন্ধ করা যাবে না।

৭. ব্যালট বক্সের নিরাপত্তা

  • খালি বক্স না দেখানো: ভোট শুরু হওয়ার আগে উপস্থিত এজেন্টদের খালি ব্যালট বক্স  ‘জিরো’ কাউন্ট না দেখিয়ে ভোট শুরু করা যাবে না।
  • ত্রুটিপূর্ণ সিল: ব্যালট বক্স সিল করার সময় যথাযথ প্রোটোকল অনুসরণ না করা বা দুর্বল সিল ব্যবহার করা যাবে না।
  • সংরক্ষণ: ভোট শেষে ফলাফল ঘোষণার পর ব্যালট বক্স বা ইভিএম অরক্ষিত অবস্থায় রাখা যাবে না।

৮. শৃঙ্খলা ও ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা

  • মাদক বা নেশাজাতীয় দ্রব্য: দায়িত্ব পালনকালে কোনো প্রকার নেশাজাতীয় দ্রব্য বা মাদক গ্রহণ করা যাবে না।
  • গণমাধ্যমের সাথে কথা বলা: রিটার্নিং অফিসারের অনুমতি ছাড়া মিডিয়ার সামনে নীতিগত কোনো বক্তব্য বা ভোটের ফলাফলের পূর্বাভাস দেওয়া যাবে না।
  • ধর্মীয় বা জাতিগত বৈষম্য: কোনো বিশেষ ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গের ভোটারের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বা বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না।

৯. ভোট গণনা ও ফলাফল সংক্রান্ত কঠোর নিয়ম

  • এজেন্টদের অনুপস্থিতিতে গণনা: পোলিং এজেন্টদের উপস্থিত থাকার সুযোগ না দিয়ে ভোট গণনা শুরু করা যাবে না। তাদের সামনেই ব্যালট বক্স খুলতে হবে।
  • বাতিল ভোটের ভুল ব্যাখ্যা: ব্যালট পেপারে অস্পষ্ট সিল বা একাধিক প্রতীকে সিল থাকলে তা নিজের ইচ্ছামতো বৈধ বা অবৈধ ঘোষণা করা যাবে না। নির্বাচন কমিশনের সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন অনুযায়ী (যেমন: দুই ঘরের মাঝখানে সিল পড়লে কোন ঘরটি প্রাধান্য পাবে) সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
  • কাটাকাটি বা ফ্লুইড ব্যবহার: ফলাফল বিবরণী বা টালি শিটে কোনো প্রকার কাটাকাটি, ঘষামাজা বা ফ্লুইড ব্যবহার করা যাবে না। ভুল হলে তা কেটে পাশে সই করতে হবে, কিন্তু মুছ ফেলা যাবে না।

১০. আইন-শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা

  • গ্রেপ্তারের নির্দেশ প্রদানে সীমাবদ্ধতা: প্রিসাইডিং অফিসার কেবল ভোটকেন্দ্রের ভেতরে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিতে পারেন, কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে আটকে রাখার নির্দেশ দিতে পারেন না।
  • অস্ত্রধারীদের অনুমতি: প্রার্থী বা প্রার্থীর দেহরক্ষী যদি বৈধ অস্ত্র নিয়েও আসেন, তবুও তাদের ভোটকক্ষে অস্ত্রসহ প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না।
  • অনুমোদিত কার্ড ছাড়া প্রবেশ: নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত পরিচয়পত্র বা বিশেষ পাস ছাড়া কোনো সাংবাদিক বা পর্যবেক্ষককে ভোটকক্ষে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না।
  • কানেকশন বিচ্ছিন্ন করা: ভোট চলাকালীন বা ভোট শেষ হওয়ার আগে ইভিএমের কোনো তার বা মেমোরি কার্ড খোলা যাবে না।
  • ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট: ইভিএমের ব্যাটারি ব্যাকআপ নিয়ে কোনো অবহেলা করা যাবে না এবং চার্জ শেষ হওয়ার আগে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

১১. গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষা

  • ব্যালট পেপারের ছবি তোলা: কোনো কর্মকর্তাকে ব্যালট পেপারের ছবি তুলতে দেওয়া বা ভোটারকে ছবি তোলার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
  • সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট: কেন্দ্রের ভেতর থেকে সরাসরি ফেসবুক লাইভ করা বা কেন্দ্রের ভেতরের পরিস্থিতির ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা কর্মকর্তাদের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
  • ভোটার তালিকা হস্তান্তর: সরকারি ভোটার তালিকার কপি কোনো অননুমোদিত ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর বা কাউকে কপি করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

নির্বাচনি কর্মকর্তাদের এই বিধিনিষেধগুলো কেবল নিয়ম নয়, বরং জনমতের পবিত্রতা রক্ষার হাতিয়ার। যেকোনো ধরনের নিয়মভঙ্গ বা অবহেলার জন্য ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO)’ অনুযায়ী জেল, জরিমানা বা চাকরিচ্যুত হওয়ার মতো কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতাই একটি সফল নির্বাচনের মূল ভিত্তি।