ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিতে কী আছে?

জুবায়ের দুখু
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলাফল অনুযায়ী নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ২০০৮ সালের পর দীর্ঘ সময় পর একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটছে, যা অনেকের কাছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই হিসেবে বিবেচিত। তবে এই পরিবর্তনের পথ ছিল নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অনিশ্চয়তায় ভরা। সাধারণ ভোটের পাশাপাশি এবার জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা নির্বাচনকে আরও তাৎপর্যময় করে তুলেছে।

নির্বাচনের প্রাক্কালে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে গত ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওপর ১,৬৩৮টি পণ্যে আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে, ফলে মোট শুল্কহার ৩৫ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিচ্ছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত আমদানি শুল্ক আয়ের প্রায় ৩৮ শতাংশ হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

এই চুক্তি শুধু শুল্কহার কমানোতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্য, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও নীতিকাঠামোয় বিস্তৃত পরিবর্তনের অঙ্গীকার এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চুক্তিপত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাম ৫৯ বার এবং বাংলাদেশের নাম ২০৫ বার এসেছে, যা দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিভিন্ন মহলে।

চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশ ও সেবা ক্রয় বাড়াবে। এর আওতায় সংস্থাটি ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও ক্রয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি, বিশেষত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)—আমদানি বাড়াবে। আগামী ১৫ বছরে জ্বালানি আমদানির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার।

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিবছর অন্তত ৭ লাখ মেট্রিক টন গম (পাঁচ বছরের জন্য), সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলার মূল্যের বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য (যেটি কম) এবং তুলা আমদানি করবে। এসব কৃষিপণ্যের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

এ ছাড়া সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বৃদ্ধির উদ্যোগ এবং কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম আমদানি সীমিত রাখার কথাও উল্লেখ রয়েছে, যদিও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাম স্পষ্ট করা হয়নি।

চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)-এ সব ধরনের ভর্তুকির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে খনিজ, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সমান বা তার চেয়ে বেশি সুবিধা দিতে হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ক্রয়ে বিধিনিষেধ আরোপের শর্তও রাখা হয়েছে।

শুল্ক ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, কোটা আরোপ না করা এবং অশুল্ক-বাধা কমানোর বাধ্যবাধকতাও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমদানি লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন রাখতে হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগারের সনদপ্রাপ্ত মার্কিন পণ্যে অতিরিক্ত পরীক্ষা আরোপ করা যাবে না। কারিগরি মান, বিধিমালা ও সামঞ্জস্য মূল্যায়ন প্রক্রিয়াও বৈষম্যমুক্ত রাখতে হবে।

শ্রম খাতে বাধ্যতামূলক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলেও শ্রম অধিকার কার্যকর করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষা আইন কার্যকর বাস্তবায়নের শর্তও যুক্ত রয়েছে।

অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও চুক্তিটি বিস্তৃত। সমুদ্রবন্দর, লজিস্টিকস ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন ও ‘এক্সপোর্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন রেগুলেশনস (ইএআর)’ অনুযায়ী পণ্যের অননুমোদিত রপ্তানি রোধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করতে হবে।

কৃষিখাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি মানদণ্ড স্বীকৃতি দিতে হবে এবং জৈব প্রযুক্তিপণ্যের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো বজায় রাখতে হবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার ২৪ মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বিক্রিত জৈব প্রযুক্তিপণ্যের আমদানিতে অতিরিক্ত অনুমোদন বা বিশেষ লেবেলিংয়ের শর্ত প্রত্যাহার করতে হবে।

মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় কপিরাইট, ট্রেডমার্ক ও পেটেন্ট আইনে কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তিতে যোগদানের অঙ্গীকার রয়েছে। ডিজিটাল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আন্তসীমান্ত তথ্যপ্রবাহের অনুমতি, ইলেকট্রনিক কনটেন্টে কাস্টমস শুল্ক না আরোপ এবং মার্কিন কোম্পানির ওপর বৈষম্যমূলক ডিজিটাল কর না বসানোর শর্ত অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

এই চুক্তি সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্যনীতি, শ্রমনীতি, কৃষি, জ্বালানি, নিরাপত্তা ও ডিজিটাল কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের জন্য এটি হবে একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ—কীভাবে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করে চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়, সেটিই এখন প্রধান প্রশ্ন।