ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করার পর এরই মধ্যে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। নির্বাচনের পরদিনেই নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। আগামী ১২ মার্চ সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি।
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকারের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। আর ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন শামসুল হক টুকু।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সংসদের স্পিকারের পদত্যাগ ও ডেপুটি স্পিকারের কারান্তরীণ থাকায় সংসদের প্রথম অধিবেশন কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটি নিয়েও নানা প্রশ্ন সামনে আসছে।
সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পর্কে বলা আছে, কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ সদস্যদের মধ্য হইতে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করিবেন এবং এই দুই পদের যে কোনোটি শূন্য হইলে সাত দিনের মধ্যে কিংবা ওই সময়ে সংসদ বৈঠকরত না থাকিলে পরবর্তী প্রথম বৈঠকে তাহা পূর্ণ করিবার জন্য সংসদ সদস্যদের মধ্য হইতে একজনকে নির্বাচিত করিবেন।
সংবিধানে আরও বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য হলে বা কোনো কারণে তারা দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য এই দায়িত্ব পালন করবেন। তবে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী প্রথম অধিবেশন পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনীত করতে পারেন।
আবার সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদে বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য হলেও পরবর্তী উত্তরাধিকারী দায়িত্বভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা স্বীয় পদে বহাল আছেন বলে গণ্য হবেন।
সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিগত সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার দুজনই অনুপস্থিত। যে কারণে একটা সংসদ অধিবেশন ডাকার পর কী হবে, সেটি নিয়ে একটা সংকট আছে। কেননা এটা ব্যতিক্রমী একটা ঘটনা।
তার মতে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুজনের একজনও যদি না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি অধিবেশন পরিচালনা করতে পারেন কার্যপ্রণালি বিধির (৫) ধারা অনুযায়ী।
অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বলেন, এটা যদি অনুসরণ করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে মনোনয়ন আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বলবেন, হয়তো সেভাবেই হবে।
স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য শপথ নেন। একই দিন বিকেলে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, আগামী মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে। ওই অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন।
গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংবিধান ও কার্যপ্রণালিতে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিগত সংসদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু করতে হবে। এরপর ওই অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে।
সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করতে হবে।
নিয়ম অনুযায়ী, কোনো একজন সংসদ সদস্য স্পিকার পদে কারও নাম প্রস্তাব করে সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে নোটিশ দেবেন। অন্য একজন সংসদ সদস্যকে সেই প্রস্তাবে সমর্থন জানাতে হবে। যার নাম প্রস্তাব করা হবে, তিনি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনে সম্মত—এমন লিখিত বিবৃতিও নোটিশের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। এরপর প্রস্তাবটি সংসদ সদস্যদের ভোটাভুটিতে যাবে।
অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বলেন, যদি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে একাধিক প্রার্থী না থাকেন, তাহলে কণ্ঠভোটের মাধ্যমেই তাদের নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। সাধারণত স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তার সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হলে অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হবে। এরপর রাষ্ট্রপতি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন। তারা শপথ নেওয়ার পর তাদের সভাপতিত্বে পরবর্তী সংসদীয় কার্যক্রম শুরু হবে।
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বা পদ শূন্য না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের পদে বহাল থাকবেন। নতুন সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠন না হওয়া পর্যন্ত তারা আগের পদেই দায়িত্ব পালন করবেন।
নতুন সংসদের অধিবেশন শুরু হলে এবং নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার শপথ গ্রহণ করলে পূর্ববর্তী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কার্যকালের অবসান ঘটবে।
বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার—দুই পদই সাধারণত সরকারি দল থেকে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তবে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার-সংক্রান্ত 'জুলাই সনদ'-এ বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
-20260224063500.webp)


