বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। সংবাদমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সম্মেলন কিংবা সাধারণ মানুষের আলোচনায় এই শব্দটি বারবার উঠে আসছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন বলতে আসলে কী বোঝায়? কেন এটি ঘটছে এবং এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে?
এই প্রতিবেদনে জলবায়ু পরির্বতন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
কোনো একটি অঞ্চলের দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা আবহাওয়ার গড় বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় জলবায়ু। আর সেই দীর্ঘদিনের পরিচিত জলবায়ুর ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটাকেই বলা হয় জলবায়ু পরিবর্তন।
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। এর ফলে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধারা বদলে যাচ্ছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে মানুষের জীবনযাত্রায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে নিরাপদ পানির সংকট আরও তীব্র হবে। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়বে, যা বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
বিশ্বের কিছু অঞ্চল অতিমাত্রায় উষ্ণ হয়ে উঠবে। অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হবে। ফলে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে এবং অনেক এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ, অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও আকস্মিক বন্যার মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটবে। এতে মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলো এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে কম সক্ষম হওয়ায় তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে।
বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে উত্তর মেরুর বরফ এবং বিভিন্ন হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং উপকূলীয় নিচু অঞ্চলগুলো ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া সাইবেরিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের স্থায়ীভাবে জমাট বাঁধা মাটি (পারমাফ্রস্ট) গলতে শুরু করায় বরফের নিচে আটকে থাকা মিথেন গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে। মিথেন অত্যন্ত শক্তিশালী একটি গ্রিনহাউস গ্যাস। ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বনাঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকিও বাড়ছে।
জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বহু প্রাণী তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে নতুন পরিবেশে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু পরিবর্তনের গতি এতটাই দ্রুত যে অনেক প্রজাতি নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারছে না এবং বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে।
উত্তর মেরুর বরফ গলে যাওয়ায় শ্বেত ভালুকের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। একইভাবে আটলান্টিক মহাসাগরের স্যামন মাছও বিপন্ন হয়ে পড়ছে, কারণ তারা যে নদীগুলোতে ডিম পাড়ে সেসব নদীর পানি ক্রমেই উষ্ণ হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, সাগরের পানিতে অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড মিশে অম্লতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রান্তীয় অঞ্চলের প্রবালপ্রাচীর ধ্বংসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
প্রাকৃতিক কারণে জলবায়ুতে কিছু পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। তবে বর্তমানে যে হারে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, তার প্রধান কারণ মানুষের কর্মকাণ্ড।
শিল্পবিপ্লবের পর থেকে কলকারখানা, যানবাহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল, গ্যাস ও কয়লার ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। এসব জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পবিপ্লবের আগের সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। উনবিংশ শতকের তুলনায় বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশ গত দুই দশকেই ঘটেছে।
এ ছাড়া নির্বিচারে বন উজাড়ও জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। গাছপালা কার্বন শোষণ করে রাখে। কিন্তু বন ধ্বংস হলে সেই কার্বন আবার বায়ুমণ্ডলে ফিরে যায়।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা গেলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
এর ফলে— ১) ব্রিটেনে অতিবৃষ্টির কারণে ঘন ঘন বন্যা দেখা দিতে পারে। ২) সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ছোট ছোট দ্বীপ ও দ্বীপরাষ্ট্র বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। ৩) আফ্রিকার বহু দেশে দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। ৪) অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরার প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।
এদিকে বিশ্বের দেশগুলোকে ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাসের নেট-শূন্য নির্গমনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে। অর্থাৎ যতটুকু গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হবে, ততটুকু শোষণের জন্য বনায়নসহ বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ লক্ষ্য অর্জন করা গেলে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। বিজ্ঞানীরা এখন নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ বা অন্যান্য চরম আবহাওয়ার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নির্ণয় করতে সক্ষম হচ্ছেন।
এর ফলে ভবিষ্যতে দুর্যোগের পূর্বাভাস আরও নির্ভুল ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে ব্যক্তি পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব। যেমন- ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে সাইকেল বা গণপরিবহন ব্যবহার করা।, বাড়িতে জ্বালানি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।, মাংস ও দুগ্ধজাত খাবারের অতিরিক্ত ব্যবহার কমানো।, অপ্রয়োজনীয় বিমান ভ্রমণ কমিয়ে আনা।, বেশি বেশি গাছ লাগানো এবং বন সংরক্ষণে সচেতন হওয়া।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন