ইরান-আমেরিকার যুদ্ধের প্রভাবে পুরো বিশ্ব এখন তেল সংকটে ভুগছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা জ্বালানি তেল পরিবহনের অন্যতম পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এই সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। সরকার এরই মধ্যে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি অফিস ও ব্যাংকের সময়সূচি পরিবর্তন করেছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে মহানগরীর স্কুলগুলোতে রুটিন পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতসব উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেই গুড়ে বালি দিচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫ শতাংশই চলে যাচ্ছে এসব অবৈধ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জে।
সিপিডির তথ্যমতে, প্রতিদিন প্রায় ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে এই খাতে, যার সিংহভাগই নেওয়া হচ্ছে অবৈধ উপায়ে। এতে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব হারাচ্ছে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে দেশে ৬০ লাখের বেশি অটোরিকশা চলছে, যার মধ্যে কেবল ঢাকাতেই রয়েছে ১২ থেকে ১৫ লাখ। প্রতিটি রিকশায় ৪ থেকে ৬টি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি থাকে, যা পূর্ণ চার্জ হতে ৬-৮ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যয় করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষফোঁড়ার মতো ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন গলার কাঁটা। দুর্ঘটনার হিসাব ছাড়াও অন্তত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে হলে এসব রিকশাকে নিয়ম-কানুনের মধ্যে আনা জরুরি। শহর কিংবা গ্রাম-গঞ্জে অনেকেই বাসাবাড়ির সংযোগ থেকে রিকশার ব্যাটারি চার্জ দিচ্ছেন। ফলে বাসাবাড়ির লাইনের বিদ্যুৎ ব্যবহার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা যে বিল দিচ্ছেন, তা বাণিজ্যিক হারের তুলনায় অনেক কম। আবার অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধ সংযোগ নেওয়া হচ্ছে, যা সিস্টেম লস হিসেবে বিবেচিত। এর ফলেও বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি বলছে, সারা দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে রাজধানীতেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রায় ২০ লাখ অটোরিকশা। এসব অটোরিকশার কোনোটিতে ৪টি, কোনোটিতে আবার ৬টি করে ব্যাটারি লাগানো। এসব ব্যাটারি সাধারণত ১২ ভোল্টের, চার্জ হতে সময় লাগে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা।
এদিকে মন্ত্রণালয় থেকে ৩ হাজার ৩০০টি বৈধ চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন থাকলেও এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রয়েছে অবৈধ পয়েন্ট। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ১০টি জোনের মধ্যে ৮টিতেই প্রায় ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং ৯৯২টি গ্যারেজ রয়েছে।
গ্যারেজের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে মিরপুর—এখানে ৩ হাজার ৯৮৩টি চার্জিং পয়েন্ট ও ২৫৯টি অবৈধ গ্যারেজ রয়েছে। এরপর যেসব জোন আলোচিত, সেগুলো হলো—ওয়ারী, গুলশান, উত্তরা ও মতিঝিল এলাকায় হাজার হাজার অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে দিনরাত ব্যাটারি চার্জ করা হচ্ছে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান সতর্ক করে বলেন, ‘ঢাকার ২ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার মধ্যে ৫০০-৭০০ মেগাওয়াট যদি অটোরিকশাই নিয়ে নেয়, তবে সামনের গরমে ভয়াবহ লোডশেডিং ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।’
দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ এই পরিস্থিতিকে ‘ক্যান্সার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ব্যাটারি আমদানি এবং স্থানীয় কারখানাগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ঢাকাকে বাঁচানো কঠিন হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন