ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ধনীদের ওপর বসছে সম্পদ কর

শাহীনুর ইসলাম শানু
প্রকাশিত: মে ১০, ২০২৬, ০৬:৩০ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

সমাজে বৈষম্য কমিয়ে রাজস্ব আয় বাড়াতে চায় সরকার। তাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিদ্যমান সারচার্জ পদ্ধতি বাতিল করে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ‘সম্পদ কর’ চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। তবে এই উদ্যোগকে ধনীদের ওপর কর আরোপে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন বলে মনে করছেন রাজস্ব বোর্ডের অনেক কর্মকর্তা।

বিশ্বের উন্নত দেশে জার্মানি, সুইডেন ও ডেনমার্ক প্রশাসনিক জটিলতা, উচ্চ ব্যয় এবং পুঁজি পাচারের ঝুঁকির কারণে সম্পদ কর বাতিল করলেও বাংলাদেশে চালু হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সম্পদ কর বাস্তবায়ন হলে অতিরিক্ত করের বোঝা এড়াতে অনেকেই সম্পদের তথ্য গোপন করে আয়কর নথি দাখিল করতে পারে। আবার অনেকে সম্পদ পাচারের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এ ছাড়া বাস্তবায়নে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যদি কেউ তথ্য গোপন করেন, তবে সম্পদ চিহ্নিত করার মাধ্যম কি হবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

জানতে চাইলে এসএমএসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশিষ বড়ুয়া বলেন, ‘সম্পদ কর তাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ জটিল। সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ কঠিন, ফলে বিরোধ ও প্রশাসনিক ব্যয় বাড়বে।’ তিনি বলেন, ‘দেশের তথ্যভিত্তিক অবকাঠামো দুর্বল থাকায় এটি সৎ করদাতাদের ওপর চাপ বাড়াতে পারে, আর অনানুষ্ঠানিক খাতের অনেকে বাইরে থেকে যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভুলভাবে বাস্তবায়ন করা হলে এই কর শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ বিনিয়োগকারীরা সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হতে পারেন। পাশাপাশি মূলধন পাচার বাড়ার ঝুঁকিও থাকে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে’ বলেন তিনি।
এ ছাড়া যাদের সম্পদ আছে কিন্তু নগদ আয় কম। যেমন মূল্যবান বাড়ি বা নতুন ব্যবসার শেয়ার রয়েছে, তাদের জন্য এই কর পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে, যা বাধ্যতামূলক সম্পদ বিক্রি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, যোগ করেন তিনি।

প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদ করমুক্ত রাখা হবে। পরবর্তী ২ কোটি টাকার ওপর ০.২৫ শতাংশ, এরপরের ৫ কোটি টাকার ওপর ০.৫০ শতাংশ এবং তার পরের আরও ৫ কোটি টাকার ওপর ০.৭৫ শতাংশ হারে কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। এর ঊর্ধ্বে অবশিষ্ট সম্পদের ওপর ১ শতাংশ কর আরোপের সুপারিশ রয়েছে।
সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণে কমিটি বিভিন্ন সম্পদ শ্রেণির জন্য আলাদা উৎসভিত্তিক পদ্ধতির সুপারিশ করেছে। জমির ক্ষেত্রে মৌজা রেট, ভবনের জন্য গণপূর্ত বিভাগের রেট, স্বর্ণের ক্ষেত্রে বাজারদর এবং শেয়ারের ক্ষেত্রে কস্ট প্রাইস বা এনএভি বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। 

কর কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা বাড়বে এবং উচ্চ আয়ের পাশাপাশি উচ্চ সম্পদের মালিকদের কাছ থেকে বেশি রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সারচার্জ তুলে দিলে কর কাঠামো আরও সহজ হবে।

তাদের মতে, বিদ্যমান সারচার্জ ব্যবস্থা সম্পদশালীদের কার্যকরভাবে করের আওতায় আনতে পারছে না। ফলে রাজস্ব আহরণ কম হচ্ছে এবং প্রগতিশীল করনীতির বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘কেউ যদি তার আয়কর নথিতে সম্পদ গোপন করে এবং পরে তা শনাক্ত হয়, তাহলে বিদ্যমান আইনে শাস্তির বিধান আছে সেটা প্রয়োগ করা হবে। যেহেতু সম্পদ করের হার কম হবে, তাই তারা সম্পদ গোপনের পথে হাঁটবে না।’  

তিনি আরও বলেন, ‘আবার অনেকের সম্পদ আছে কিন্তু পর্যাপ্ত আয় নেই। তাদের জন্য আইনে যথেষ্ট সুযোগ থাকবে, যাতে তাদের ওপর অতিরিক্ত দায় না তৈরি হয়। ফলে সম্পদ পাচারের ঝুঁকি কম হবে,’ যোগ করেন তিনি।

বর্তমান আয়কর আইন-২০২৩ অনুযায়ী ৪ কোটি টাকার বেশি নিট সম্পদের ওপর সারচার্জ আরোপ করা হলেও এতে নানা কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করে পরামর্শক কমিটি। 

কমিটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০০-২০০ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষেত্রে কার্যকর সারচার্জ হার ০.৪৩ শতাংশ, যা ৫০-১০০ কোটি টাকার স্ল্যাবের ০.৫৪ শতাংশের চেয়েও কম। অর্থাৎ বেশি সম্পদে তুলনামূলক কম কার্যকর করহার দেখা যায়। এ ছাড়া সারচার্জ প্রদেয় আয়করের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, কেউ কম আয় দেখালে তার সারচার্জও শূন্যে নেমে আসে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ক্রয়মূল্যে সম্পদ ঘোষণা করায় প্রকৃত বাজারমূল্য অনেক ক্ষেত্রে কম দেখানো হয়।

২০২৫-২৬ কর বছরের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ হাজার ৮০৪ জন করদাতার সম্মিলিত নিট সম্পদ প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা হলেও সারচার্জ আদায় হয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট সম্পদের মাত্র ০.২৯ শতাংশ।

কমিটির তথ্যে দেখা যাচ্ছে, মাত্র ১৩ জন করদাতার হাতে মোট নিট সম্পদের ২.৬৯ শতাংশ কেন্দ্রীভূত, যেখানে তাদের গড় সম্পদ প্রায় ৬৪৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে ১০০ কোটির বেশি সম্পদ ঘোষণাকারী ১৮৬ জনের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের ১২.১২ শতাংশ।

একটি মাইক্রো-বিশ্লেষণে ২৭ জন করদাতার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ঘোষিত সম্পদের তুলনায় প্রকৃত মূল্য গড়ে ৮৯ শতাংশ বেশি হতে পারে। এতে বিদ্যমান সারচার্জ ব্যবস্থার তুলনায় সম্ভাব্য রাজস্ব ৩৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। 

এমনকি একটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বর্তমান সারচার্জ শূন্য হলেও পুনর্মূল্যায়নের পর সম্ভাব্য সম্পদ কর প্রায় ৪০ কোটি টাকা হতে পারে। এই কাঠামো বাস্তবায়ন হলে মোট রাজস্ব এক হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে তিন হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা আদায় সম্ভব।

মূল সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সম্পদ কর আইন-২০২৬’ নামে পৃথক আইন প্রণয়ন, ই-রিটার্নভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় মূল্যায়নব্যবস্থা চালু, স্থায়ী ভ্যালুয়েশন কমিটি গঠন এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দ্বিস্তরীয় কাঠামো তৈরি। পাশাপাশি প্রতি পাঁচ বছর অন্তর বিধিমালা পর্যালোচনার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে সম্পদ কর নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। ইউরোপের ফ্রান্স একসময় পূর্ণাঙ্গ সম্পদ কর চালু রাখলেও ২০১৮ সালে তা বাতিল করে কেবল রিয়েল এস্টেটভিত্তিক সীমিত করে। সরকারের যুক্তি ছিল, উচ্চ কর বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে এবং ধনীরা দেশ ছাড়ছেন।

অন্যদিকে, নরওয়ে এখনো সম্পদ কর বজায় রেখেছে, যেখানে নির্দিষ্ট সীমার বেশি সম্পদের ওপর কেন্দ্র ও স্থানীয় সরকার মিলিয়ে প্রায় ০.৮৫ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ করা হয়। সুইজারল্যান্ডে ক্যান্টনভেদে ০.১ শতাংশ থেকে ১ শতাংশের বেশি পর্যন্ত সম্পদ কর নেওয়া হয়।

লাতিন আমেরিকায় আর্জেন্টিনা মহামারির পর রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় উচ্চ সম্পদের ওপর অস্থায়ী অতিরিক্ত কর আরোপ করেছে। স্পেনে সম্পদ কর পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে, যেখানে উচ্চ সম্পদের ওপর প্রায় ৩ শতাংশ পর্যন্ত কর প্রযোজ্য হতে পারে।

তবে জার্মানি, সুইডেন ও ডেনমার্ক প্রশাসনিক জটিলতা, উচ্চ ব্যয় এবং পুঁজি পাচারের ঝুঁকির কারণে সম্পদ কর বাতিল করেছে।

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সম্পদ কর স্ল্যাব তুলনামূলকভাবে সংযত এবং ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে আংশিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্ন থেকে মাঝারি হার নির্ধারণ করলে কর ফাঁকি ও পুঁজি পাচারের ঝুঁকি কম থাকতে পারে।