শাহজাদপুরসহ চলন বিলাঞ্চলের ১৪ উপজেলার কৃষকদের ধান অকাল বন্যার কবল থেকে রক্ষায় গত প্রায় ৩৮ বছর ধরে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের রাউতারা এলাকায় ড্রেজারের মাধ্যমে নদী থেকে তোলা বালু দিয়ে তৈরি করা হয় অস্থায়ী রাউতারা রিং বাঁধ।
বৃহত্তর চলনবিলাঞ্চলের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ, তাড়াশ, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, চাটমোহর, সিংড়া, বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, আত্রাই, রাণীনগর, শেরপুর ও নন্দীগ্রামের হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান রক্ষায় প্রতি বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড কোটি কোটি টাকা সরকারি অর্থায়নে ওই বালুর বাঁধ নির্মাণ করে। সেইসাথে ওই বাঁধ নির্মাণের সাথে চলে পুকুরচুরি। বন্যার শুরুতেই ওই বালুর বাঁধ ভেঙে চলনবিলের ১৪ উপজেলার বিস্তীর্ণ কাঁচা-আধাপাকা ধান বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। সেইসাথে তলিয়ে যায় হাজারো কৃষকের বুকভরা স্বপ্ন আর আশা! অথচ স্থায়ীভাবে রাউতারা থেকে তাড়াশের নিমাইচড়া পর্যন্ত ওই বাঁধটি নির্মাণ করা হলে একদিকে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের অপচয় রোধ হতো, অন্যদিকে কৃষকেরাও রক্ষা পেত অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে।
তথ্যনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৪ বছরে উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের রাউতারা স্লুইস গেটের পশ্চিম পাশে ১ হাজার ২৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের এ অস্থায়ী রিং বাঁধ নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। এ বছরে এ বাঁধ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। চলনবিলের কৃষকদের ধান রক্ষার নামে বালু দিয়ে অস্থায়ী এ বাঁধ নির্মাণ ও ভাঙার কাজ চলছে চার দশক ধরে। যদিও প্রতি বছরই বাঁধটি নির্মাণের এক থেকে দেড় মাসের মাথায় মাছ আহরণ ও নৌকা চালানোর সুবিধার জন্য অদৃশ্য শক্তির ইশারায় কেটে দেয় স্থানীয় মৎস্য শিকারি ও নৌযান শ্রমিকরা। এ যেন রাউতারা রিং বাঁধের নিয়তিই হলো ভাঙা আর গড়া! আর সেই গল্পই টানা ৩৮ বছর ধরে চলছে।
তথ্যনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর তথা চলনবিলের হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমির ধান রক্ষার্থে একটি বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। যা ১৯৮০ সালে শেষ হয়। কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত বাঁধটি ১৯৮৮ সালে দেশব্যাপী ইতিহাসের ভয়াবহতম বন্যায় বাঘাবাড়ি-নিমাইচড়া অংশের রাউতারা স্লুইস গেটের পশ্চিম পাশে ভেঙে যায়। সেই থেকে প্রতি বছর ওই অঞ্চলের কৃষি জমির ধান রক্ষায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে এই স্থানে বালি দিয়ে রিং বাঁধ তৈরি করে।
বাঁধটির নির্মাণকাজ মার্চ মাসে শুরু হয় এবং বাঁধের স্থায়িত্ব ২৮ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। নির্মাণ শেষে বাঁধ ভেঙে না গেলেও প্রতি বছর জুন মাস শেষে মাছ আহরণ ও নৌকা চালানোর সুবিধার জন্য কেটে দেন মৎস্য শিকারি ও নৌযান শ্রমিকেরা। এতে চোখের সামনে সরকারের কোটি টাকা জলে ভেসে যায়। আর স্থানীয়রা বাঁধের পাইলিংয়ের বাঁশ, খুঁটি ও বালুর বস্তা লুট করে বিক্রি করে।
অথচ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন কঠোর নজরদারি করলে বাঁধটি সহজেই রক্ষা করা যায়। এলাকাবাসী ও স্থানীয় কৃষকেরা জানায়, সিরাজগঞ্জ, নাটোর ও পাবনাসহ চলনবিল অঞ্চলের প্রায় ৬২ হাজার ৫৩৯ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়। কৃষকদের অভিযোগ, অনেক সময় বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই এর বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। ফলে আগাম বন্যার পানি ঢুকে উৎপাদিত ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে ধান কেটে ঘরে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ফসল কাটাই সম্ভব হয় না। তাই প্রতি বছরই রাউতারা রিং বাঁধকে ঘিরে উদ্বেগে থাকেন কৃষকরা। তবে এবার পানি তুলনামূলক কম থাকায় ধান কাটার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
তারা আরও জানান, নিমাইচরা বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছিল উত্তর পাশের সব জমি ত্রি-ফসলি জমির আওতায় আনার জন্য। লুটপাটের কৌশল অবলম্বনের জন্য ১৯৮৮ সালের পর থেকে প্রতিবারই বালু দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়াও রাউতারা স্লুইস
গেটটিও প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। স্লুইস গেটটি সংরক্ষণসহ একটি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও দুর্নীতি বন্ধের দাবি জানান।
এ ব্যাপারে পোতাজিয়া ইউপি চেয়ারম্যান (দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত) শহিদুল ইসলাম বলেন, এখানে পাম্প হাউসসহ স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ হলে দুই ফসলি জমিতে বহুমাত্রিক ফসল উৎপাদন করা সম্ভব। তাই তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এখানে একটি স্থায়ী বাঁধসহ একটা পাম্প হাউস নির্মাণের আশুদৃষ্টি কামনা করেন।
এব্যপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, এখানে একটি স্থায়ী বাঁধের পাশাপাশি আধুনিক পাম্প হাউস নির্মাণ করা হলে শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণই নয়, দুই ফসলি জমিতে বহুমুখী ফসল চাষের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এতে এলাকার কৃষি অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া প্রতিবছর বন্যার পানিতে এ অঞ্চলের প্রায় ৩ হাজার হেক্টর গো-চারণভূমি তলিয়ে যাওয়ায় গবাদিপশু নিয়ে চরম সংকটে পড়েন খামারিরা। চারণভূমি ও ঘাসের জমি ডুবে যাওয়ায় গো-খাদ্যের তীব্র
অভাব দেখা দেয়, ফলে পশুপালন ব্যাহত হয় এবং কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি বাড়ে। তাই কৃষক ও এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত একটি স্থায়ী বাঁধ ও পাম্প হাউস নির্মাণে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেন।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী এবং উক্ত রিং বাঁধের তদারকি কর্মকর্তা ইমতিয়াজ আহম্মেদের কাছে বালু দিয়ে অস্থায়ী বাধ নির্মাণের বিষয়ে বলেন, এবার প্রাক্কলনে বালু দিয়েই বাঁধ নির্মাণ সম্পূর্ণ করার জন্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেই মোতাবেক টপ ৪ মিটার রেখে কাজ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ জায়গাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন এবং কম্বাইন বা মাল্টি-ভেন্ট রেগুলেটরসহ স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য বৃহত্তর পরিকল্পনা করা হচ্ছে ও এটি বাস্তবায়ন হলে এ সমস্যা আর থাকবে না।

