পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ১০০টি ইলেকট্রিক বাস কেনার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাস কেনা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির জন্য সরকারের কাছে ৪০০ কোটি টাকা অনুদান বা ইকুইটি সহায়তা চেয়েছে সংস্থাটি। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের কাছে সম্প্রতি একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিআরটিসি শাখা।
এর আগে একই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দের আবেদন করলে অর্থ বিভাগ সরাসরি অনুদান দেওয়ার পরিবর্তে এটিকে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নীতি ও আর্থিক সক্ষমতার বিষয় বিবেচনা করে অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ঋণভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করলে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হয়।
তবে এবারও অনুদানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বিআরটিসি। সংস্থাটির যুক্তি, বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা ও নিজস্ব তহবিলের সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিয়ে এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপ ভবিষ্যতে বিআরটিসির ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা তৈরি করবে। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে ৪০০ কোটি টাকা সরাসরি অনুদান বা ইকুইটি হিসেবে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিআরটিসির চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আধুনিক, কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব ‘সবুজ পরিবহন করিডোর’ গড়ে তুলতে বহরে ইলেকট্রিক বাস যুক্ত করা জরুরি। এর মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানো, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং নাগরিকদের জন্য উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ১০০টি ইলেকট্রিক বাস কিনতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪০ কোটি টাকা। প্রতিটি বাসের আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। পাশাপাশি ব্যাটারি চার্জিংয়ের জন্য ২৫টি চার্জিং স্টেশন স্থাপনে প্রয়োজন হবে ৫০ কোটি টাকা। প্রতিটি স্টেশনের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা।
এ ছাড়া খুচরা যন্ত্রাংশ কেনার জন্য ৩৫ কোটি টাকা, চালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তার জন্য ২০ কোটি টাকা, বাস পরিবহন ও নিবন্ধন খাতে ২৫ কোটি টাকা এবং বিআরটিসির ডিপো উন্নয়ন ও সংস্কারে ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
বিআরটিসি জানিয়েছে, নতুন ইলেকট্রিক বাসগুলো ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ রুটের পাশাপাশি দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর আন্তঃনগর সেবায় যুক্ত করা হবে। বিশেষ করে রাজধানীর বায়ুদূষণ কমাতে এসব বাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংস্থাটির মতে, ইলেকট্রিক বাসের প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয় ডিজেল বা সিএনজিচালিত বাসের চেয়ে কম। এতে ভবিষ্যতে সরকারি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি যাত্রীসেবার মানও উন্নত হবে। বিআরটিসি আরও জানিয়েছে, বরাদ্দ পাওয়া অর্থ সরকারি আর্থিক নীতিমালা ও ক্রয় আইন মেনেই ব্যবহার করা হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক বলেন, গণপরিবহন আধুনিকায়ন ও পরিবেশ রক্ষায় ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ ইতিবাচক। বিশ্বের অনেক দেশেই জনসেবামূলক পরিবহন প্রতিষ্ঠানকে সরকার ভর্তুকি বা অনুদানের মাধ্যমে সহায়তা দিয়ে থাকে, কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য সামাজিক কল্যাণ।
তিনি বলেন, সরকারি অর্থ ব্যবহারে অবশ্যই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাস কেনা থেকে শুরু করে অবকাঠামো নির্মাণ সব পর্যায়ে সঠিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিআরটিসিকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্প বা যানবাহন কেনার জন্য বারবার সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে না হয়।


