আন্তর্জাতিক সেবামূলক সংগঠন রোটারি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশে পরিচালিত কার্যক্রমে আর্থিক অনিয়ম, বৈদেশিক মুদ্রা আইন লঙ্ঘন, করফাঁকি, মানি লন্ডারিং এবং কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। গত ৬ জুলাই চেয়ারম্যান বরাবর দাখিল করা ওই অভিযোগে রোটারি ক্লাব অব চিটাগাং বেঙ্গল সিটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম খলিল মিন্টু রোটারি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কার্যক্রমের নামে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের দাবি করেন।
লিখিত অভিযোগে রোটারিয়ান ইব্রাহিম খলিল মিন্টু দাবি করেন, বাংলাদেশে রোটারি ইন্টারন্যাশনালের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হলেও সংগঠনটির বাংলাদেশে কোনো নিবন্ধিত আইনগত সত্তা নেই। এনজিওবিষয়ক ব্যুরো, সমাজসেবা অধিদপ্তর কিংবা অন্য কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই সংগঠনটির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে রোটারির প্রায় আট হাজার সদস্য রয়েছে। প্রতি সদস্যের কাছ থেকে বছরে গড়ে ১০০ মার্কিন ডলার সদস্য ফি আদায় করা হয়। সে হিসাবে শুধু বার্ষিক সদস্য ফি থেকেই প্রায় আট লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। অভিযোগকারীর দাবি, এই অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে বিদেশে পাঠানো হলেও এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বা বৈদেশিক মুদ্রা আইনের বিধান অনুসরণ করা হয় না।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, সংগঠনটির বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের সদস্যদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে একেএস পদবির জন্য একজন সদস্যকে কমপক্ষে দুই লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় তিন কোটি টাকা) অনুদান দিতে হয়। এ ছাড়া ‘মেজর ডোনার’ ক্যাটাগরিতে ১০ হাজার থেকে আড়াই লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত অনুদান দিতে হয়। একইভাবে ‘পল হ্যারিস ফেলো (পিএইচএফ)’ হওয়ার জন্য একজন সদস্যকে এক হাজার মার্কিন ডলার এবং ‘মাল্টিপল পল হ্যারিস ফেলো (এমপিএইচএল)’ হওয়ার জন্য দুই হাজার মার্কিন ডলার বা তারও বেশি অনুদান দিতে হয়।
অভিযোগকারী দাবি করেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর শত শত ব্যক্তি এসব ক্যাটাগরিতে অনুদান দিয়ে পদ-পদবি নিয়ে থাকেন, যার ফলে কয়েক মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। যারা অনুদান দিয়ে এসব পদ-পদবি নিয়ে থাকেন তাদের আয়কর ফাইলে এসব অর্থের লেনদেনের বিবরণ নেই। এমনকি রোটারি কর্তৃপক্ষ অনুদান থেকে পাওয়া অর্থের আয়কর সরকারকে প্রদান করেছেন না। অথচ কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে নির্বিঘ্নে পাচার হয়ে যাচ্ছে রোটারিয়ানদের কাছ থেকে অনুদান অথবা চাঁদা হিসেবে গ্রহণ করার পর।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের দুটি রোটারি জেলা থেকেই প্রতি বছর অন্তত ১৫ থেকে ২০ লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ থেকে ২৪ কোটি টাকা বিভিন্ন খাতে সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠানো হয়। অভিযোগকারীর ভাষ্য, এই বিপুল অর্থের উৎস, কর পরিশোধ এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে কখনো কোনো সরকারি তদন্ত হয়নি।
এ ছাড়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক রোটারি সম্মেলনকে কেন্দ্র করে একটি ফান্ডের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১২ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ কর পরিশোধ এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এখান থেকে বিপুল অর্থ বিদেশে পাঠানো হয়েছে বলে তার অভিযোগ।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, রোটারি ফাউন্ডেশন, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল, বার্ষিক রোটারি সম্মেলন ২০২৬ এবং রোটারি আইএলটিএস ২০২৬-এর নামে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক হিসাব পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব হিসাবের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ ও বিদেশে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির নামেও অনুমোদনবিহীন ব্যাংক হিসাব খুলে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, সংগঠনটির আর্থিক কার্যক্রমে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি, একজন ফিসক্যাল এজেন্ট এবং একজন ভারতীয় নাগরিক দীর্ঘদিন ধরে এসব অর্থ সংগ্রহ ও বিদেশে প্রেরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। অভিযোগপত্রে তাদের নাম ও যোগাযোগের তথ্যও সংযুক্ত করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭; বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম) নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৬ এবং প্রচলিত আয়কর আইনের বিভিন্ন বিধানের উল্লেখ করে অভিযোগকারী দাবি করেছেন, রোটারির বাংলাদেশে পরিচালিত আর্থিক কার্যক্রমে এসব আইনের লঙ্ঘন হয়েছে। তিনি দুদকের কাছে অভিযোগের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব জব্দ ও লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা, অর্থের উৎস ও গন্তব্য অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন।
সূত্র জানিয়েছে, দেশের ৬৪ জেলায় রোটারি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সদস্য রয়েছে। একেক জেলায় একেক সংখ্যার সদস্য। পাঁচ শতাধিক রোটারি ক্লাব ঢাকা ও চট্টগ্রাম দুটি ভাগে বিভক্ত। গত ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশে রোটারি ক্লাবের কার্যক্রম চলছে। এ ক্লাব যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক। সারা বিশ্বে রোটারি ক্লাবের কার্যক্রম রয়েছে। এখানে ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বেচ্ছায় সদস্য হয়। সদস্য হতে ১০০ ডলার চাঁদা দিতে হয়। এরপর সদস্য টিকিয়ে রাখতে প্রতিমাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। এসব চাঁদার টাকায় সামাজিক কর্মকাণ্ড না করে পুরো অর্থ রোটারি ইন্টারন্যাশনালের সদর দপ্তরে পাচার করা হয়।
জানতে চাইলে অভিযোগকারী ইব্রাহিম মিন্টু রূপালী বাংলাদেশকে জানান, গত তিন বছর ধরে রোটারি ইন্টারন্যাশনাল রোটারিয়ানদের চাঁদার টাকার কোনো হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিমাসে রোটারিয়ান নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দিয়ে থাকেন। এ চাঁদার টাকা ক্লাবের বিভিন্ন ব্যাংক হিসেবে জমা হয়। এসব অর্থ সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের কথা থাকলেও গত তিন বছর রোটারি ক্লাবের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড করা হয়নি। কিন্তু টাকা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। এ মূলে রয়েছে তিন ব্যক্তি। তারা পরস্পর যোগসাজশে রোটারিয়ানদের দেওয়া অর্থ দেশের বাইরে পাচার করে দিচ্ছেন। এরা হলেন- সাবেক জেলা গভর্নর বর্তমানে কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর ইশতিয়াক জামান, মোহাম্মদ আইয়ুব এবং ভারতীয় নাগরিক, ভারতের রোটারি ইন্টারন্যাশনালের গভর্নর আশীষ ঘোষ।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রোটারি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর ইশতিয়াক জামান জানান, ইব্রাহিম খলিল মিন্টুর অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তিনি এসব অভিযোগ এনে ইতোপূর্বে আদালতে ৪ বার মামলা করে প্রতিটি মামলায় হেরেছেন। ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে আদালতে মামলা করার কারণে আদালতও তাকে ভর্ৎসনা করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, নানা অপকর্মের অভিযোগে রোটারি ইন্টান্যাশনাল সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে ইব্রাহিম খলিল মিন্টুর। মূলত সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি রোটারি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
ইশতিয়াক জামান জানান, বাংলাদেশের রোটারিয়ানরা যে দান-অনুদান করেন সব অর্থ ব্যাংক হিসেবে জমা হয় এবং প্রতিবছর ক্লাবের বোর্ড কর্তৃক ৩ দফা অডিট করা হয়। অডিট শেষে হিসাব প্রতিটি সদস্যের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ থেকে কোনো অর্থ দেশের বাইরে পাঠানো হয় না। এখানে প্রতিটি সদস্য নিজেরাই স্বেচ্ছায় সদস্য ফির বাইরে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য দান-অনুদান করে থাকেন। রোটারিয়ানদের অর্থে যশোরে একটি হাসপাতালসহ স্কুল-কলেজ পরিচালনা হয়ে থাকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী শিশুদের পোলিও মুক্ত করতে টিকা উৎপাদন ও টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে যে অর্থ ব্যয় হয় সেটি রোটারিয়ানদের দেওয়া টাকায় হয়ে থাকে। বাংলাদেশও এর অংশীদার। রোটারি ইন্টারন্যাশনাল দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিসহ নানা প্রতিকূল অবস্থায় বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। আর এসব অর্থ রোটারি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের যারা সদস্য তাদের দেওয়া।
দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম জানান, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কার্যক্রমের নামে দেশের বাইরে অর্থ পাচারের একটি অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছে। অভিযোগটি দুদকের অভিযোগ যাচাই-বাছাই সেলে পাঠানো হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

