× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ১ বছর

‘মাটির ঘরে এখনো কাঁদছে আনসুর মতো শিশুপ্রাণ’

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

‘গত বছর এই সময়ে এই বাচ্চাটা আমাদের ঘরে ছিল। এই বাচ্চাটা ভোর ৭টায় উঠে স্কুলে যেত। দুপুর ১টায় স্কুল শেষে কোচিং ছিল। তারপর বাসায় ফিরে গোসল, দুপুরের খাওয়া। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত একবার জেনারেল ম্যাডাম আর একবার আরবি ম্যাডামের কাছে পড়তে বসা। এর মধ্যে ছোট ভাই ওসমানের সঙ্গে একশবার মারামারি চলত। প্রায় দিনই নিজের টিফিন থেকে ওসমানের জন্য নিয়ে আসত। এসব ভাগাভাগি নিয়ে আবার মারামারি। আমি সালিশ করতে গেলে বলত, ‘আমি না খেয়ে নিয়ে আসছি। ওসমান সব একা খেতে চাচ্ছে।’ এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। আমাদের আলোময় ঘর। হাসি-খেলায়, চিৎকারে আনন্দে ভরা ঘর। কিন্তু আমরা তো জানতে পারলাম না, আমাদের হাতে আর মাত্র ১০টা দিন সময় আছে। দেশে যুদ্ধ নেই, তবু ১০ দিন পর স্কুলের ওপর একটি যুদ্ধবিমান এসে পড়বে। আগুনে আমার বাচ্চাটা পুড়ে যাবে। আমার মা মারা যাবে। বাসার নিচ থেকেই বিদায় জানাতে হবে। আমার এই কলিজাটা স্কুলে গিয়ে আর ফিরবে না—জানলে কি স্কুলে যেতে দিতাম? দিতাম না। আল্লাহকে কত করে ডাকলাম। আল্লাহ, একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটাও। আমার প্রাণ নিয়ে হলেও আনসুর প্রাণ ফিরিয়ে দাও। কিন্তু আল্লাহ শুনলেন না। মাটির ঘরে রেখে দিয়ে আসতে হলো। এই যে, আমার এই বাচ্চা, আমার কলিজাটা। এই ফুল-পাখি এখন ছোট্ট একটি মাটির ঘরে একা একা থাকে।’

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার এক বছর পরও ওই ঘটনায় নিহত শিশু আনসুর ছবি নিয়ে এমনই শোকের মাতম করছেন তার একমাত্র মামা লিয়ন মীর। আনসুর মা-বাবা এখনো কথা বলার অবস্থায় নেই জানিয়ে লিয়ন বলেন, ‘এমন শোক কোনো পরিবারের জীবনে যেন না আসে। প্রতিদিন নামাজে বসে আল্লাহর কাছে এই দোয়া করি।’

শুধু আনসুর পরিবারই নয়, আজকের দিনের এই নির্মম ঘটনা ঘিরে নিহত নিষ্পাপ শিশুদের পরিবারেও চলছে এমন শোকের মাতম। সেদিনের দুর্ঘটনায় নিহত হয় সপ্তম শ্রেণির ইংলিশ ভার্সনের আরেক শিক্ষার্থী মাহতাব রহমান। রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল থেকে ঢাকায় এসেছিল আরও ভালো লেখাপড়ার আশায়। তার পড়ার টেবিলটি পড়ে আছে এক বছর ধরে। সেই টেবিল দেখিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মাহতাবের বাবা মিনহাজ রহমান। চোখের পানি বুকে চেপে রেখে বলেন, ‘ছেলেটার পড়ার টেবিলটা এক বছর ধরে একইভাবে পড়ে আছে। বই সরেনি, খাতা সরেনি। প্রতিদিন মা এসে বইগুলো মুছে দেন, গুছিয়ে রাখেন। মাহতাবকে ছাড়া আমরা কেউ ভালো নেই। আমাদের বাসাটা এখন কবরস্থানের মতো। মাহতাবের মা এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি। ড্রয়ারের ভেতর মাহতাবের কাপড়গুলো বুকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো দিনরাত কাটান। জানি না, আদৌ আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব কি না।’

২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী ও পাইলটসহ অন্তত ৩৫ জন প্রাণ হারান এবং বহু মানুষ দগ্ধ ও আহত হন। 

গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নেওয়া আহতদের বেশির ভাগের বয়স ৯ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। যাদের অধিকাংশের শরীরই মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাদের শ্বাসনালি। ২১ জুলাই ৩০ থেকে ৫৭ জন রোগী ভর্তি হলেও পরের দিন অর্থাৎ ২২ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আরও ৩ জন এবং সিএমএইচ থেকে আরও ২ জন রোগীকে আনা হয় এই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য। এই ঘটনায় নির্মম মৃত্যুকে বরণ করেন ৩৮ জন। আহত অবস্থায় এখনো বিছানায় কাতরাচ্ছে ৬৩ জনের বেশি শিক্ষার্থী।

যা বলছে তদন্ত প্রতিবেদন: মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে পাইলটসহ নিহতদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক ও একজন কর্মচারীসহ আরও একজন ছিলেন। দুর্ঘটনার পর ২৯ জুলাই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ৫ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কাছে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেয় কমিটি। প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী ও বিশেষজ্ঞদের সাক্ষ্য নিয়ে ১৬৮টি তথ্য উদ্ঘাটন করে কমিটি এবং ৩৩টি সুপারিশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রশিক্ষণ চলাকালে পাইলটের উড্ডয়ন ত্রুটি ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে।

তদন্ত প্রতিবেদনের মূল সুপারিশ ও প্রশাসনের গাফিলতি নিয়ে নিহত তানভীরের বাবা রুবেল মিয়া বলেন, ‘তদন্ত কমিশন গঠন হয়েছিল। সেখানে দুটি বিষয় উল্লেখ আছে। একটি হলো, ভবন নির্মাণে কোড মানা হয়নি; আরেকটি হলো, বিমানের উড্ডয়নে ত্রুটি ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ কারণ আমাদের জানানো হয়নি।’

ক্ষত নিয়ে দুর্বিষহ দিন কাটছে আহতদের: ‘যখন স্কুলে যেতাম, পড়তাম, সারাদিন একটা ডেইলি রুটিন ছিল। এখন ওরকম কোনো রুটিন নেই। একটু ব্যায়াম করলাম, এটা-সেটা করলাম। স্কুলে গেলে একটা সময় কেটে যেত—হাসলাম, পড়লাম। এখন কী করছি, না করছি, কোনো ঠিকঠিকানা নেই।’

কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে ১১ বছর বয়সি শিশু আবিদুর রহিম আবিদ। উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই শিক্ষার্থী দীর্ঘ ১৮৩ দিন হাসপাতালে লড়াই শেষে বাসায় ফিরেছে। তবে এখনো কাটেনি ক্ষত। এই দীর্ঘ সময়ে তার শরীরে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩৬টি অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। দিতে হয়েছে ১৮ ব্যাগ রক্ত। আগুনে ঝলসে গেছে তার হাত, পা ও মুখমণ্ডল।

দুর্ঘটনার সময় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত রুবাইদা নূর আলবিরা, এখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। আবিদের মতো দীর্ঘ হাসপাতালবাসের ভয়াবহতা তার গল্পে নেই, কিন্তু এক বছর আগের সেই দুর্ঘটনার স্মৃতি তার জীবনেও রয়ে গেছে।

ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব: ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলেও নিহত ও আহত শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়ে জটিলতা কাটেনি। ক্ষতিগ্রস্ত অভিভাবকদের অনেকেই জানিয়েছেন, এ ঘটনায় সরকার যে ক্ষতিপূরণ দিতে চাইছে, তা ‘অপ্রতুল’। আহত শিক্ষার্থীদের অনেকের চিকিৎসার খরচই এর কয়েক গুণ। অন্যদিকে, সরকারের তরফ থেকেও নতুন করে এ নিয়ে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

নিহত চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসনিম আফরোজ আয়মানের মা আয়েশা আক্তার কানন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু আমরা এক টাকাও ছুঁইনি।’

কী ঘটেছিল সেদিন: ২০২৫ সালের ২১ জুলাই, সোমবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এতে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে পুড়ে যায় ছোট্ট শিশুদের কোমল শরীর। পাশাপাশি ওই ভবনটিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাণ হারান উড়োজাহাজটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম।

এই ঘটনার এক দিন পর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আনিসুর রহমান রায়হান জনস্বার্থে একটি রিট দায়ের করেন। ওই রিটে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি সরকারকে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছিল।

একজনও ক্ষতিপূরণ নেননি: মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নুরুন নবী বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি কমিটি করে দিয়েছিল। সেখানে আমি বেশ কয়েকবার তাঁদের সঙ্গে দেখা করেছি। যে আর্থিক সাহায্য করা হয়েছে, দ্যাট ওয়াজ নট এনাফ। অভিভাবকরা তো সন্তুষ্ট হননি।’

তিনি বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাদের অনেকবার বলেছে টাকাটা গ্রহণ করার জন্য। কিন্তু অভিভাবকরা যেহেতু টাকাটা নিতে রাজি হননি, যার ফলে আমরা টাকাটা গ্রহণ করিনি।’

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে কেউ যোগাযোগ করেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এখন পর্যন্ত নতুন সরকার আসার পর আমাদের সঙ্গে আসলে ওইভাবে কেউ যোগাযোগ করেনি।’

ভেঙে ফেলা হচ্ছে সেই ভবন: নির্মম সেই ঘটনার এক বছর পর ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। তবে নির্মম ঘটনার স্মৃতি ধরে রাখতে চাইলেও কীভাবে তা রাখা হবে, সে বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

গতকাল সোমবার সরেজমিনে ওই স্কুল ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটি ভাঙার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। চারদিকে উঁচু টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। বাইরে থেকে ভবনটি খুব একটা চোখে পড়ে না। এর দ্বিতীয় তলা ভাঙার কাজ প্রায় শেষের দিকে।

কী বলছেন দায়িত্বশীলরা: মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি আজ শুধু একটি দুর্ঘটনার নাম নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা, সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন নীতির একটি কঠিন স্মারক হয়ে আছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘নিহতদের পরিবারের কাছে প্রতিটি দিনই যেন ২১ জুলাইয়ের সেই বিকেল, যেদিন এক মুহূর্তে থেমে গিয়েছিল অসংখ্য স্বপ্ন। আমরা তাদের ব্যথায় সমব্যথী।’

Link copied!