তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালনের পর গত শুক্রবার রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। তার পদত্যাগের পর দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদকে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সে হিসেবে আগামী অক্টোবরের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা।
এদিকে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষমতাসীন বিএনপির ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন নাম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার পাশাপাশি আলোচনায় উঠে এসেছে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি পদে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিএনপির অভ্যন্তরে রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রম এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
তবে দলীয় নেতাদের বাইরে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আলোচনায় এসেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম। রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার গ্রহণযোগ্যতা, নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার কারণে তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
অন্যদিকে বিএনপির একটি অংশের মতে, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রমকেও স্থায়ীভাবে দায়িত্বে রাখা হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে দলীয় পর্যায়ে ভিন্নমত রয়েছে।
২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে তার গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার কারণে রাষ্ট্রপতি পদে তার নাম নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও জাতীয় সংকট, নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসরে রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সে বিবেচনায় ড. ইউনূসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি করা হলে সরকারের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
তবে বিএনপির ভেতরে আরেকটি মত হলো, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রামে পরীক্ষিত, দলের প্রতি বিশ্বস্ত এবং আদর্শিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো নেতাকেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া উচিত।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সে বিষয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী ও দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের মতে, রাষ্ট্রপতি এমন একজন হওয়া উচিত, যিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে পরীক্ষিত, দলের সংকটে বিশ্বস্ত এবং দলের আদর্শের প্রতি আস্থাশীল।
অন্যদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের বিষয়টি দলীয় প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে। গঠনতন্ত্র ও আইন অনুসরণ করেই যথাসময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে এখনো নানা জল্পনা-কল্পনা চললেও বাস্তবে বিএনপি এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। ফলে শেষ পর্যন্ত দলটি রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষিত কোনো নেতার ওপর আস্থা রাখবে, নাকি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেবে— সেই সিদ্ধান্ত কেবল দলটির কাছেই সীমাবদ্ধ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন