আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পরদিন রাজধানীতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান হাদির ওপর গুলি চালানো হয়। ঘটনার প্রায় ৬৫ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও শুটার ও মোটরসাইকেলচালককে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযুক্তরা দেশে আছে নাকি সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়েছে- এ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
রোববার (১৪ ডিসেম্বর) অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, হামলায় জড়িত সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান এবং তার সহযোগী মোটরসাইকেলচালক আলমগীর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে।
তিনি জানান, তাদের বর্তমান অবস্থান ভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটি শহরে।
পুলিশ জানিয়েছে, ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় দুজনকে শনাক্ত করা গেছে। শনাক্ত ব্যক্তিরা হলেন শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান এবং মোটরসাইকেলচালক আলমগীর শেখ। তবে তারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে- এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য পুলিশের কাছে নেই।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ইমিগ্রেশন ডেটাবেজে এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজনদের দেশত্যাগের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সব ইমিগ্রেশনে তাদের পাসপোর্ট ব্লক করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ ধরে নিচ্ছে আসামিরা দেশেই রয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধীরা যদি দ্রুত আইনের আওতায় না আসে, তাহলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় কাজ করে না। এতে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ২০১৯ সালের ১১ মে ঘোষিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির সদস্য ছিলেন।
ওসমান হাদির প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারসহ বিভিন্ন জায়গায় ফয়সাল করিমের সঙ্গে হাদির সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক ছবি পাওয়া গেছে। এসব ছবিতে থাকা ফয়সাল করিমের চেহারার সঙ্গে হামলায় জড়িত শুটারের চেহারার সাদৃশ্য থাকায় তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে।
হাদির ওপর হামলার ঘটনায় নাম আসার পর ফয়সাল করিমের সঙ্গে আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশের দুবারের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তোলা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ঢাকা–৮ আসনে হাদির সঙ্গে গণসংযোগ এবং বাংলামোটরে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের আড্ডায় ফয়সালের উপস্থিতির ছবিও ভাইরাল হয়।
এসব কারণে ধারণা করা হচ্ছে, ফয়সাল করিম দীর্ঘদিন ধরে ওসমান হাদিকে অনুসরণ করছিলেন।
এর আগে, গত বছরের ২৮ অক্টোবর ঢাকার আদাবরের বাইতুল আমান হাউজিং সোসাইটি এলাকায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়া স্কুলের অফিসে অস্ত্রের মুখে ১৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি ছিলেন ফয়সাল করিম। মামলার পর র্যাব তাকে গ্রেপ্তার করে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, পাঁচটি গুলি, তিনটি মোবাইল ফোন ও পাঁচ হাজার টাকা উদ্ধার করে।
ওই মামলায় চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট থেকে জামিন পান ফয়সাল করিম। পরে জামিনের মেয়াদ বাড়াতে ১২ আগস্ট পুনরায় আবেদন করলে হাইকোর্ট তাকে নতুন করে এক বছরের জামিন দেন।
জামিনে থাকা অবস্থায় এবার তার বিরুদ্ধে ওসমান হাদিকে গুলি করার অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
জুলকারনাইন সায়ের আরও দাবি করেন, হামলাটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে চালানো হয়েছে এবং একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির জন্য আরও কয়েকটি হিট টিম প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যবহৃত অস্ত্রটি জ্যাম হয়ে যাওয়ায় শুটার একটি গুলি করতে সক্ষম হন, যদিও তার পরিকল্পনা ছিল চারটি গুলি করার।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, ঘটনার পরপরই শুটার ফয়সাল ও আলমগীর একটি প্রাইভেটকারে মিরপুর থেকে আশুলিয়া হয়ে গাজীপুর হয়ে ময়মনসিংহে যান। সেখানে গাড়ি পরিবর্তন করে তারা হালুয়াঘাট উপজেলার ভুটিয়াপাড়া সীমান্ত দিয়ে মোটরসাইকেলযোগে পালিয়ে যান বলে দাবি করা হয়। সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করা দুজনকে আটক করে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
এ ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার সন্দেহভাজনরা ভারতে প্রবেশ করে থাকলে গ্রেপ্তারের আহ্বান জানায়।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে ভারতের অবস্থান অপরিবর্তিত।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন