ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন : সশস্ত্র বাহিনীর ত্যাগ ও গৌরব

আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫, ০৯:৫৭ পিএম
শান্তিরক্ষা মিশন। ছবি- সংগৃহীত

বিশ্বশান্তি কোনো বিমূর্ত স্লোগান নয়; বরং এটি তাজা রক্ত, অপরিসীম ত্যাগ-সাহস ও মানবিক দায়িত্ববোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক অমোঘ সত্য। সুদানের আবেই অঞ্চলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতাধীন কাদুগলি লজিস্টিক বেসে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলায় ৬ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর শহীদ হওয়ার ঘটনা আবারও সেই নির্মম বাস্তবতাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। 

দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গ করা এই শান্তিরক্ষীরা শুধু নিজ নিজ জেলার সন্তান ছিলেন না; তারা হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বমানবতার প্রতিনিধি। তাদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের জাতীয় মর্যাদা, আন্তর্জাতিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক অঙ্গীকারের এক গভীর বেদনাময় অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে বলে আমি মনে করি।

শান্তিরক্ষা মিশনে সশস্ত্র বাহিনীর মহান ত্যাগ ও গৌরবগাথা বলার পূর্বে জাতিসংঘের জন্ম ও শান্তিরক্ষা ধারণার বিকাশ নিয়ে খানিকটা আলোচনা করতে চাই।

আপনারা জেনে থাকবেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা মানবসভ্যতাকে এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসার মুখে দাঁড় করিয়েছিল। ভয়াবহ সেই যুদ্ধে কোটি কোটি প্রাণহানি, ধ্বংসস্তূপে পরিণত সভ্যতা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ১৯৪৫ সালে গঠিত হয় জাতিসংঘ। এর মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি মানবাধিকার সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন সহযোগিতা জোরদার করা। যদিও জাতিসংঘ সনদে সরাসরি ‘শান্তিরক্ষা মিশন’ শব্দটি উল্লেখ ছিল না, তবু সময়ের প্রয়োজনে এই ধারণার বিকাশ ঘটে। এবং ১৯৪৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম সামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েনের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সূচনা হয়।

পরবর্তীকালে স্নায়ুযুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, জাতিগত সংঘাত ও রাষ্ট্রভাঙনের মতো জটিল বাস্তবতায় শান্তিরক্ষা মিশন শুধু যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং শান্তি প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রগঠন, মানবিক সহায়তা, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও পুনর্বাসনের মতো বহুমাত্রিক দায়িত্ব যুক্ত হয়েছে।

এবার আসা যাক, আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর মহান ত্যাগ ও গৌরব প্রসঙ্গে

বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে মাত্র ১৫ জন সামরিক পর্যবেক্ষক পাঠানোর মাধ্যমে। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত, উন্নয়নশীল দেশ হয়েও আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় যুক্ত হওয়া ছিল বাংলাদেশের জন্য এক সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। সেই ছোট সূচনা আজ রূপ নিয়েছে এক অনন্য সাফল্যে। তিন দশকের বেশি সময়ে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত থেকে দেশের জন্য বয়ে এনেছেন বহুমাত্রিক সাফল্য।

বাংলাদেশ আজ বিশ্বের শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশগুলোর একটি। আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হলেও মানবসম্পদের মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান অনস্বীকার্য। এই অবস্থান কেবল সংখ্যার অর্জন নয়; বরং এটি শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও মানবিক আচরণের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন বলে আমি মনে করি।

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামে বাংলাদেশকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৬৮ জনের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারিয়েছেন। শত শত শান্তিরক্ষী আহত হয়েছেন। প্রতিটি শহীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি পরিবারের আজীবন বেদনাবিধুর গল্প।

সুদানের কাদুগলি লজিস্টিক বেসে ড্রোন হামলায় শহীদ ছয় শান্তিরক্ষীর আত্মদান সেই ধারাবাহিক ত্যাগেরই আরেকটি অধ্যায় বলে আমি মনে করি। করপোরাল থেকে সহায়ক কর্মচারী— সবাই প্রমাণ করেছেন যে, শান্তিরক্ষা শুধু অস্ত্রধারীদের কাজ নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত মানবিক মিশন, যেখানে প্রতিটি দায়িত্ব সমান গুরুত্বপূর্ণ। আহত শান্তিরক্ষীদের চিকিৎসা ও পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা যেমন আশার বার্তা দেয়, তেমনি এই ঘটনা শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তার কথাও আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের মানবিক আচরণ। যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আফ্রিকার জঙ্গল, মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি কিংবা ইউরোপের তুষারাচ্ছন্ন অঞ্চল— সবখানেই বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা হয়ে উঠেছেন ভরসার প্রতীক। অস্ত্রের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা, ত্রাণ বিতরণ, অবকাঠামো পুনর্গঠন, শিশু ও নারীদের সুরক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতায় তাদের অবদান জয় করেছে স্থানীয় জনগণের মন।

এই মানবিক ভূমিকা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বিশ্ব দরবারে কেবল একটি শান্তিরক্ষী রাষ্ট্র নয়; বরং দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। শত শত নারী শান্তিরক্ষী ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তারা প্রমাণ করেছেন যে, শান্তিরক্ষা লিঙ্গনিরপেক্ষ মানবিক দায়িত্ব। নারী শান্তিরক্ষীদের উপস্থিতি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি যে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রগতিশীল মানসিকতা ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য শুধু কূটনৈতিক গৌরব নয়; সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিরক্ষীদের পাঠানো বৈদেশিক আয় দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও পেশাদার মান আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও কাজে লাগছে।

জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের প্রশংসা করা হয়েছে। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম বা দ্বিতীয় স্থানে থাকা কাকতালীয় কোনো ব্যাপার নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি আস্থার ফল। এতে কোনো সন্দেহ নেই— বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা আজ বিশ্বশান্তির জন্য এক বিশ্বস্ত ও অবিচ্ছেদ্য অংশীদার।

সুদানের ড্রোন হামলা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি সতর্ক সংকেত বলে আমি মনে করি। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হুমকি, সশস্ত্র মিলিশিয়া ও রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতার যুগে শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। সুতরাং এমন প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘকে নতুন কৌশল, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও শক্তিশালী রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা ছাড়া বিশ্বশান্তির কথা চিন্তা করা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের চেতনায় মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে। সুদানে শহীদ ছয় শান্তিরক্ষীর রক্ত সেই ধারাবাহিকতারই অংশ বলে আমি মনে করি। তারা প্রমাণ করেছেন যে, বাংলাদেশ শান্তির জন্য প্রয়োজন হলে জীবনও দিতে পারে।

শেষ কথা

পরিশেষে বলতে চাই, আত্মত্যাগের জন্য শুধু শোক নয়— আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আরও জোরদার করতে হবে। শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ সম্মান করতে হবে। কারণ লাল-সবুজের পতাকা কেবল বাংলাদেশের আকাশেই নয়; বরং উড়ছে বিশ্বশান্তির প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রান্তরে। তাই আমি বিশ্বাস করি যে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ত্যাগ ও গৌরব বিশ্বসভায় এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আলো ছড়াবে যুগ থেকে যুগান্তরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। নিহত শান্তির দূতদের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং আহতদের জন্য নিরন্তর শুভকামনা।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা
ahabibhme@gmail.com