× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আব্দুল্লাহ আল রাকিব, সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২০, ২০২৫, ০৩:৪২ পিএম

হাদি হত্যাকাণ্ড : ফ্যাসিবাদীদের সঙ্গী করা কতটা নিরাপদ?

আব্দুল্লাহ আল রাকিব, সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২০, ২০২৫, ০৩:৪২ পিএম

ওসমান হাদি। ছবি- সংগৃহীত

ওসমান হাদি। ছবি- সংগৃহীত

একটি রাষ্ট্রকে চেনা যায় তার ক্ষমতাধরদের ভাষায় নয় বরং ভিন্নমতাবলম্বীদের নিরাপত্তায়। যখন একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হন, যখন মতপ্রকাশের মূল্য হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন, তখন সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক আত্মপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক নতুন ভোরের দেখা পেয়েছিল। কিন্তু সেই ভোরের সূর্য পূর্ণিমার আলো ছড়ানোর আগেই মেঘের ঘনঘটা দেখা দিচ্ছে। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর রাজপথে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও তরুণ রাজনীতিক শরিফ ওসমান হাদির ওপর যে নৃশংস হামলা চালানো হয়েছিল, তার করুণ সমাপ্তি ঘটেছে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে। হাদির এই মৃত্যু কেবল একটি শোক সংবাদ নয় বরং এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি ভয়াবহ সতর্কবার্তা। প্রশ্ন হলো এই বার্তাটি কার জন্য এবং কেন?

এই হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে, যেই ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়ে ছাত্র-জনতা অকাতরে প্রাণ দিল, সেই ফ্যাসিবাদের দোসর বা তাদের অবশিষ্টাংশকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সঙ্গী করা কি আদৌ নিরাপদ? এই হামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার প্রবণতা ইতোমধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, এটি ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি’, ‘অপরাধী চক্রের কাজ’, কিংবা ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এ ধরনের ব্যাখ্যাগুলো সবসময় ভিন্নমতের মানুষদের ক্ষেত্রেই হাজির হয়? কেন ক্ষমতার ঘনিষ্ঠরা আক্রান্ত হলে তা ‘রাষ্ট্রের ওপর হামলা’ হয়ে ওঠে, অথচ ভিন্নমতাবলম্বীদের রক্ত ঝরলে তা হয়ে যায় ‘দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা’?

হাদির ওপর হামলার সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত। নতুন কণ্ঠ, নতুন শক্তি, নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠছে। হাদি কোনো প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার অংশ নন। তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী নন। তিনি একজন তরুণ, যিনি কথা বলেন, উচ্চকণ্ঠে, স্পষ্ট ভাষায় এবং আপসহীনভাবে। এমন মানুষদের ইতিহাসে বারবার ‘অস্বস্তিকর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ তারা প্রশ্ন তোলেন, তারা ভয় পায় না, তারা ক্ষমতার সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে নিরাপদ থাকার রাজনীতি করেন না। হাদির ওপর হামলা সেই পুরোনো ইতিহাসেরই এক নতুন অধ্যায়। এই প্রেক্ষাপটে একজন তরুণের ওপর প্রকাশ্য গুলি কোনো সাধারণ অপরাধ হতে পারে না। এটি ভয় দেখানোর রাজনীতি। এটি সতর্কবার্তা, ‘লাইন অতিক্রম করলে পরিণতি আছে।’ পুরাতন ফ্যাসিবাদি চর্চার নতুন প্রয়োগ।

শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং পেশাদার খুনিদের কাজ। ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা আততায়ীরা পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে তার মাথায় গুলি চালায়। গুলির আঘাতে তার মস্তিষ্কের টিস্যু অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটি বুলেটের স্প্লিন্টার মস্তিষ্কের গভীরে আটকে থাকে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এভারকেয়ার এবং সবশেষে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে সাত দিন লড়াইয়ের পর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই লড়াকু যোদ্ধা। সরকার এই বীরের সম্মানে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে এবং তার পরিবারকে আজীবন দেখাশোনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, কেন একজন বিপ্লবীর জীবন এভাবে রাজপথে কেড়ে নেওয়া সম্ভব হলো?

এই হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওসমান হাদি কেবল একজন সম্ভাব্য সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীই ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন এক কণ্ঠস্বর। আওয়ামী লীগের পনেরো বছরের দুঃশাসনকে যারা তাত্ত্বিকভাবে ‘ফ্যাসিবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, হাদি ছিলেন সেই আন্দোলনের সামনের সারির নেতা। আওয়ামী আমলের ফ্যাসিবাদ কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করেনি বরং এটি একটি সুসংগঠিত কাঠামো গড়ে তুলেছিল, যেখানে রাষ্ট্র, দল এবং নেতা একীভূত হয়ে গিয়েছিল। এই ব্যবস্থায় ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ নির্মাণের মাধ্যমে ভিন্নমতাবলম্বীদের ‘রাজাকার’ বা ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া হতো। হাদির ওপর এই হামলা সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতিরই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ, যেখানে বুলেট দিয়ে সত্যকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়।

হাদির ওপর হামলার পর রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়াও হতাশাজনক। কিছু প্রতিবাদ হয়েছে, বিবৃতি এসেছে, কিন্তু সেই প্রতিবাদে যে ঐক্য, যে তীব্রতা থাকা দরকার ছিল, তা কি আমরা দেখেছি? নাকি আমরা আবারও পরিচিত বিভাজনে আশ্রয় নিয়েছি, কে কোন দলে, কে কোন মতাদর্শে? ফ্যাসিবাদ ঠিক এভাবেই কাজ করে। ফ্যাসিবাদ সবসময় ট্যাংক নিয়ে আসে না, কখনো কখনো আসে মোটরসাইকেলে চড়ে। সবসময় রাষ্ট্রীয় ঘোষণায় নয়, অনেক সময় আসে অঘোষিত নীরবতায়। যখন রাষ্ট্র কথা বলে না, তখনই ফ্যাসিবাদ সবচেয়ে জোরে কথা বলে। ফ্যাসিবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়; এটি একটি আচরণ, একটি সংস্কৃতি। যেখানে ক্ষমতার সঙ্গে থাকা নিরাপদ, আর প্রশ্ন তোলা বিপজ্জনক। যেখানে ‘আমাদের লোক’ হলে সব মাফ, আর ‘অন্যরা’ হলে আইনও অকার্যকর।

হাদির মৃত্যুর পর যে প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠেছে, তা হলো—এই সংস্কৃতির সঙ্গে আপস করা কতটা নিরাপদ? ইতিহাস বলে, মোটেও নিরাপদ নয়। আজ যে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করে নিজেকে ‘নিরাপদ’ ভাবছে, আগামীকাল সেই ফ্যাসিবাদই তার দরজায় কড়া নাড়বে। কারণ ফ্যাসিবাদ বন্ধুত্ব চেনে না, চেনে শুধু আনুগত্য। আর আনুগত্যের মেয়াদ খুবই স্বল্পস্থায়ী। আজ যে চুপ, কাল সে-ই হতে পারে টার্গেট। এটাই ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য, ভুক্তভোগীকেও আমরা দলীয় পরিচয়ে বিচার করি। তদন্তকারীদের মতে, এই হামলার পেছনে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল। র‌্যাবের প্রাথমিক তদন্তে ফয়সল নামক এক যুবকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, যার সাথে বড় অংকের অর্থ লেনদেন এবং হামলার আগে-পরে গোপন যোগাযোগের প্রমাণ মিলেছে। এমনকি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি অভিযোগ করেছে যে, ভারতে আশ্রয়ে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার দলের নেতারাই এই ‘সন্ত্রাসবাদী’ হামলার মাস্টারমাইন্ড। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি স্পষ্ট যে ফ্যাসিবাদের শিকড় এখনো উপড়ে ফেলা যায়নি; বরং তা সীমান্ত পেরিয়ে বা ছদ্মবেশে রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়ে গেছে।

পুরাতন ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন বা তাদের সঙ্গী করার ঝুঁকি এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, যখনই কোনো স্বৈরাচারী শাসনের সুবিধাভোগীরা নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুনর্বাসিত হয়, তারা সুযোগ পেলেই পুরোনো ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। ফ্রান্সের ভিশি (Vichy) সরকারের সমর্থকদের উদাহরণ এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য, যারা ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পরেও প্রশাসনিক ও আইনি মারপ্যাঁচে নিজেদের প্রভাব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। বাংলাদেশেও বিগত ১৫ বছরে আমলাতন্ত্র, পুলিশ এবং বিচার বিভাগে যে দলীয় ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল, তাদের একটি বড় অংশ এখনো বহাল তবিয়তে আছে। হাদির মতো বিপ্লবীদের নিরাপত্তা দিতে এই কাঠামোর ব্যর্থতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ফ্যাসিবাদের ভিত্তিকে অক্ষুণ্ণ রেখে গণতন্ত্রায়ন সম্ভব নয়।

গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের নাম নয়। গণতন্ত্র মানে ভিন্নমতের নিরাপত্তা। গণতন্ত্র মানে এমন পরিবেশ, যেখানে সরকারবিরোধী কণ্ঠও রাষ্ট্রের সমান সুরক্ষা পায়। হাদির ওপর হামলা সেই মৌলিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং এই চ্যালেঞ্জের জবাব না দিলে আমরা সবাই ধীরে ধীরে অনিরাপদ হয়ে উঠব। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল অপরাধীর খোঁজ করা নয় বরং আস্থার পুনর্গঠন। মানুষ যেন বিশ্বাস করতে পারে, কথা বললে গুলি খেতে হবে না। প্রশ্ন তুললে নিখোঁজ হতে হবে না। মত প্রকাশ করলে পরিবার হুমকির মুখে পড়বে না। এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা না গেলে তদন্ত, গ্রেপ্তার, সংবাদ সম্মেলন- সবই অর্থহীন। বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বিএনপির মতো বড় দলগুলো অনেক ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদ বিরোধী অবস্থান নিলেও ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটন নিয়ে তাদের অবস্থান অনেক সময় অস্পষ্ট মনে হয়। আবার ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। হাদির ওপর হামলার পর ভারতের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের যে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে, তা গভীর উদ্বেগের। বাংলাদেশ যখন ভারত থেকে ‘সন্ত্রাসবাদ রপ্তানি’র অভিযোগ তুলছে, তখন ভারত একে ‘মিথ্যা আখ্যান’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাবেক শাসনের দোসরদের ভারত যদি রাজনৈতিক আশ্রয় এবং সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দেয়, তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কি কখনোই নিশ্চিত হবে? ফ্যাসিবাদের সঙ্গীরা যখন বিদেশি শক্তির লেজুড়বৃত্তি করে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলে, তখন তাদের সাথে কোনো প্রকার আপস করা মানে হলো জাতীয় আত্মহত্যার সামিল।

হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার কেবল একটি ফৌজদারি মামলা নয়, এটি বিপ্লবের চেতনার টিকে থাকার লড়াই। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস হাদির ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তির নিশ্চয়তা দিয়েছেন এবং দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু কেবল সান্ত্বনা বা আর্থিক সহায়তা দিয়ে এই রক্তের দায় মেটানো সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ফ্যাসিবাদের বিষমুক্ত করতে হবে। পুলিশ এবং প্রশাসনকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে যাতে তারা কোনো দলের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে নয় বরং জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা নাগরিক হিসেবে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? আমরা কি কেবল সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে দায় শেষ করব? নাকি বাস্তব জীবনে ভয়ের রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেব? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ফ্যাসিবাদ কখনো একা আসে না; তাকে জায়গা করে দেয় সাধারণ মানুষের নীরবতা। হাদির ওপর হামলা আমাদের সামনে আয়না ধরেছে। সেই আয়নায় আমরা দেখছি একটি সমাজ, যেখানে সত্য বলা ঝুঁকিপূর্ণ, আর চুপ থাকা লাভজনক। প্রশ্ন হলো, আমরা কোন সমাজে থাকতে চাই? আজ হাদি আক্রান্ত, কাল অন্য কেউ। আজ আমরা চুপ, কাল আমাদের কণ্ঠও রুদ্ধ হতে পারে। তাই প্রশ্নটি ব্যক্তিগত নয়, সামষ্টিক। ফ্যাসিবাদের সঙ্গী করা কতটা নিরাপদ? উত্তর একটাই, একদমই নিরাপদ নয়। কারণ ফ্যাসিবাদ শেষ পর্যন্ত কাউকেই নিরাপদ রাখে না। সে কেবল ভয়ের উত্তরাধিকার তৈরি করে, যেখানে পরবর্তী শিকার কে হবে, তা কেউ জানে না। হাদির মৃত্যু যেন আমাদের শেখায়—বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিবাদের সাথে সহাবস্থান অসম্ভব এবং আত্মঘাতী।

ফ্যাসিবাদীদের সঙ্গী করা কেন নিরাপদ নয়, তার অন্যতম বড় কারণ হলো ‘বিচারের অভাব’ এবং ‘ইনসাফের অনুপস্থিতি’। বিগত দেড় দশকে সংঘটিত গুম, খুন এবং জুলাই-আগস্টের গণহত্যার সাথে জড়িতদের যদি যথাযথ বিচার না করে পুনরায় রাজনীতির মূলধারায় আনা হয়, তবে তা হাদির মতো সাহসী তরুণদের জন্য মৃত্যু পরোয়ানা হয়ে দাঁড়াবে। এই নৃশংস হামলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অন্ধকার অধ্যায় উন্মোচন করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও তার বিষদাঁত এখনো উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করা কেবল আদর্শগত বিচ্যুতি নয়, বরং এটি একটি বড় ধরনের জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি। তদন্ত ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি বলে প্রতীয়মান হয়:

১. হামলার দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার: ওসমান হাদির ওপর হামলার মূল হোতাদের শনাক্ত করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ফয়সল এবং তার নেপথ্যে থাকা নেটওয়ার্ককে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

২. ট্রানজিশনাল জাস্টিস বা ক্রান্তিকালীন ইনসাফ: বিগত ১৫ বছরের মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং দুর্নীতির বিচারের জন্য বিশেষ আদালত গঠন করতে হবে। অপরাধীদের বিচারের আওতায় না এনে তাদের সাথে কোনো প্রকার রাজনৈতিক সমঝোতা করা বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থি ।

৩. সাংবিধানিক সংস্কার এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত: ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ অনুযায়ী বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে যাতে কোনো ব্যক্তি বা দল পুনরায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হতে না পারে ।

৪. কূটনৈতিক সমতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব: ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সমতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উসকানিমূলক হস্তক্ষেপকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে হবে ।

৫. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব পুনরুদ্ধার: পুলিশ এবং প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা হাদির মতো নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে এবং কোনো গোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত না হয় ।

পরিশেষে, শরীফ ওসমান হাদি আজ বাংলাদেশের মুক্তিকামী তরুণ প্রজন্মের এক অগ্নিপরীক্ষার নাম। তার এই আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়, সে জন্য রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। তার অকাল এই মৃত্যুর সঠিক বিচারই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ কি একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, নাকি পুনরায় ফ্যাসিবাদের অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত হবে। ইতিহাসে দেখা গেছে, মুসোলিনি বা হিটলারের মতো ফ্যাসিস্টদের শেষ পরিণতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। বাংলাদেশেও যারা ফ্যাসিবাদের ভূত পুনরায় জাগিয়ে তুলতে চায়, তাদের উপযুক্ত বিচার এবং সামাজিক বর্জনই হতে পারে হাদির প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি। সামনে আসছে জাতীয় নির্বচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে ডামাডোল সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা এবং বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোই এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ফ্যাসিবাদের সঙ্গীদের পুনর্বাসন বা ফ্যাসিবাদের সাথে কোনো সমঝোতা নয়, বরং তাদের কৃতকর্মের জন্য ইনসাফ নিশ্চিত করাই হবে স্থিতিশীলতার একমাত্র পথ।

আব্দুল্লাহ আল রাকিব, সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

Link copied!