মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে চলমান সংঘাত আজ আর কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা নয়; এর প্রত্যক্ষ অভিঘাত পড়ছে প্রতিবেশী বাংলাদেশের সমাজ, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর। এই সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপটি প্রকাশ পাচ্ছে মাদক পাচারের বিস্তার দিয়ে। রাখাইন অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী নেটওয়ার্কের হাতে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী মাদক অর্থনীতি, যার প্রধান ভুক্তভোগী হয়ে উঠছে বাংলাদেশ।
মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা, আইস ও অন্যান্য সিন্থেটিক মাদক এখন আর সীমান্তবর্তী এলাকার সমস্যা নয়; এটি দেশের অভ্যন্তরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। নাফ নদী, পাহাড়ি সীমান্ত ও উপকূলীয় জলপথ ব্যবহার করে মাদক পাচারকারীরা সহজেই এই বিষ আমাদের সমাজে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ক্রমেই চাপে পড়ছে।
এই মাদক প্রবাহের সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে মানবসম্পদের ধ্বংস। দেশের যুবসমাজ, যারা উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান শক্তি, তারা মাদকাসক্তির কারণে পড়াশোনা, কাজ ও সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। মাদকাসক্তি শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়; এটি একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়, সমাজে অপরাধ ও সহিংসতা বাড়ায় এবং সামগ্রিকভাবে সামাজিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে তোলে। দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থ দাঁড়ায় একটি অদক্ষ, হতাশ ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রজন্ম।
অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের ব্যয় বাড়ছে বহুগুণ। একই সঙ্গে মাদক কারবার থেকে সৃষ্ট কালো টাকা বৈধ অর্থনীতিতে অনুপ্রবেশ করে বাজার ব্যবস্থাকে বিকৃত করছে। মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি বাড়ছে, যা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি।
জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও মিয়ানমার থেকে আসা মাদক এক গভীর উদ্বেগের কারণ। মাদক থেকে অর্জিত অর্থ সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সীমান্তবর্তী অপরাধী চক্রের হাতে গেলে অপরাধ ও সন্ত্রাসের মধ্যে একটি বিপজ্জনক যোগসূত্র তৈরি হয়। এর ফল হিসেবে সীমান্তে গোলাগুলি, জেলেদের অপহরণ, রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধ বৃদ্ধি এবং পার্বত্য অঞ্চলে নতুন অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও এর প্রভাব নেতিবাচক হতে পারে। বাংলাদেশ যদি মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে, তবে কূটনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক নজরদারি এবং বাণিজ্যিক ঝুঁকি বাড়বে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যে ইতিবাচক ভাবমূর্তি বাংলাদেশ তৈরি করেছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও ব্যাহত হতে পারে।
এই বাস্তবতায় মাদক সমস্যাকে কেবল আইনশৃঙ্খলা ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা সংকট। সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অপরিহার্য। একই সঙ্গে মাদক সিন্ডিকেটের আর্থিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে জোর দিতে হবে।
পাশাপাশি, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। মাদকাসক্তদের অপরাধী নয়, রোগী হিসেবে দেখে পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে একযোগে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে, যাতে তরুণরা মাদকের ফাঁদে পা দেওয়ার আগেই সতর্ক হয়।
মিয়ানমার থেকে আসা মাদক আজ বাংলাদেশের জন্য এক নীরব কিন্তু গভীর সংকট। এখনই যদি সমন্বিত, দূরদর্শী ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এই বিষ আগামী দিনে রাষ্ট্র ও সমাজের ভিতকে আরও দুর্বল করে দেবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আর বিলম্বের সুযোগ নেই।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

