ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মাদক ও রোহিঙ্গা সংকট : জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি

রায়হানুল ইসলাম
প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩, ২০২৬, ১০:২২ পিএম
রোহিঙ্গা। সংগৃহীত ফাইল ছবি

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘাত, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে লাখো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এই মানবিক সংকটের সুযোগ নিয়েছে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মাদক চক্র। বিশেষ করে ইয়াবা, হেরোইন ও মেথামফেটামিনের মতো মাদক মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে উল্লেখ করা জরুরি—সব রোহিঙ্গা এই অপরাধে জড়িত নয়; বরং একটি ক্ষুদ্র অংশ দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা ও অপরাধী চক্রের চাপের কারণে এই নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত হচ্ছে।

মাদকের প্রধান রুটগুলো মূলত মিয়ানমারের শান ও রাখাইন রাজ্য থেকে শুরু হয়ে নাফ নদী, টেকনাফ উপকূল, পাহাড়ি সীমান্ত পথ ও সাগরপথ হয়ে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম এবং সেখান থেকে দেশের অভ্যন্তরে বিস্তৃত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থলপথের পাশাপাশি সাগরপথে মাদকের চালান বেড়েছে, যেখানে মাছ ধরার ট্রলার, ছোট নৌযান এবং কখনো কখনো মানবপাচারের রুটও ব্যবহার করা হচ্ছে। এই রুটগুলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র, স্থানীয় দালাল, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী এবং সীমান্ত এলাকার কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত উপাদান—যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

মাদকের বিস্তার বাংলাদেশের সমাজে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। তরুণ প্রজন্ম মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ায় পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে এবং উৎপাদনশীল জনশক্তি ধ্বংসের মুখে পড়ছে। মাদকাসক্তির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই, সহিংসতা ও সংগঠিত অপরাধ। স্বাস্থ্য খাতে বাড়ছে মানসিক রোগ, এইচআইভি ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের ঝুঁকি। অর্থনৈতিক দিক থেকেও মাদক একটি নীরব শোষণযন্ত্র, যা গরিব পরিবারগুলোকে আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে কালো টাকার প্রবাহ বাড়াচ্ছে।

এই সংকট মোকাবিলায় একক কোনো পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। প্রথমত, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সমন্বিত বাহিনী অভিযান এবং গোয়েন্দা তথ্যের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করে। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা, কর্মসংস্থানমূলক কার্যক্রম ও শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে তারা অপরাধী চক্রের সহজ শিকার না হয়। মানবিক সহায়তার পাশাপাশি সামাজিক পুনর্বাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।

তৃতীয়ত, মাদকবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়াকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে বড় মাদক কারবারিরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে। একই সঙ্গে কেবল দমনমূলক নয়, প্রতিরোধমূলক কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। স্কুল–কলেজ পর্যায়ে সচেতনতামূলক শিক্ষা, পরিবারভিত্তিক কাউন্সেলিং এবং গণমাধ্যমে দায়িত্বশীল প্রচারণা মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে।

চতুর্থত, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকটের রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া রোহিঙ্গা ও মাদক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আসিয়ান, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। সীমান্তপারের মাদক নেটওয়ার্ক ভাঙতে যৌথ গোয়েন্দা তৎপরতা ও তথ্য বিনিময় বাড়াতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, মাদক, রোহিঙ্গা ও সীমান্ত নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয় আলাদা নয়; বরং একই সংকটের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। মানবিক দায়বদ্ধতা ও রাষ্ট্রীয় কঠোরতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই সমাধানের পথে এগোতে হবে। আজ যদি এই সংকটকে সামগ্রিকভাবে মোকাবিলা করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে এর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মূল্য আরও ভয়াবহ হবে। তাই সময় এসেছে আবেগ নয়, বরং সুপরিকল্পিত, সমন্বিত ও টেকসই নীতির মাধ্যমে মাদকমুক্ত ও নিরাপদ বাংলাদেশের পথে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক