ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ভয়হীন ভোটাধিকার নিশ্চিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা অপরিসীম

রায়হানুল ইসলাম 
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১০:৪২ পিএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

নির্বাচনে সেনাবাহিনী হবে ভোটারদের আস্থার প্রতীক—এই প্রত্যাশা আজ আর কেবল রাজনৈতিক ভাষ্য নয়, বরং একটি অনিবার্য বাস্তবতার নাম। গণতন্ত্রের মূল শক্তি জনগণের ভোটাধিকার; আর সেই অধিকার কার্যকর হয় তখনই, যখন নাগরিকেরা ভয়হীনভাবে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বহু নির্বাচনে সহিংসতা, অনিয়ম, ভোটকেন্দ্র দখল ও প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগ মানুষের মনে গভীর অনাস্থা সৃষ্টি করেছে। এই অনাস্থার আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে নির্বাচনকালীন সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষ ভূমিকা ভোটারদের কাছে আশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

সেনাবাহিনী বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একটি বিশেষ আস্থার জায়গা দখল করে আছে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো পুনর্গঠন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর এবং সংকটকালে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা সেনাবাহিনীকে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক উত্তাপ যখন চরমে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর উপস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে বেশি নিরপেক্ষ ও কার্যকর বলে মনে করে। এই বিশ্বাসই নির্বাচনের দিন ভোটারকে ঘর থেকে বের করে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে সাহস জোগায়।

ভোটার আস্থার বিষয়টি এখানে কেন্দ্রীয়। বহু নাগরিকের মনে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—ভোট দিতে গিয়ে আমি কি নিরাপদ থাকব? আমার ভোট কি সত্যিই গণনায় যাবে? এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর না মিললে নির্বাচন অর্থবহ হয় না। সেনাবাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে, এই অনিশ্চয়তা অনেকাংশে কমাতে পারে। ভোটকেন্দ্রের বাইরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা এবং ভয়ভীতির পরিবেশ ভেঙে দেওয়া—এসব ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী ভোটারদের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।

তবে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে কোনো রকম বিভ্রান্তির সুযোগ থাকা উচিত নয়। এটি কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক ভূমিকা নয়, বরং বেসামরিক প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সহায়ক শক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন। সংবিধানের আলোকে নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে থেকে পেশাদারিত্ব বজায় রাখাই এখানে মূল চ্যালেঞ্জ। সেনাবাহিনীর কাজ হবে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, যাতে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোনো বাধা না থাকে। এই স্পষ্টতা না থাকলে উল্টো বিতর্ক তৈরি হতে পারে, যা আস্থার জায়গাকে দুর্বল করবে।

নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে সেনাবাহিনীর সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন যদি নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং তা বাস্তবায়নে সেনাবাহিনী কার্যকর সহায়তা দেয়, তবে অনিয়মের অভিযোগের দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য নিষ্পত্তি সম্ভব হবে। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও একটি বার্তা যাবে—নির্বাচনি প্রক্রিয়া সত্যিই সুরক্ষিত এবং নিরপেক্ষ। এই আস্থার পরিবেশই একটি নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দেশগুলোতে নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষ নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে এবং সহিংসতা কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শর্ত একটাই—স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। বাংলাদেশেও সেনাবাহিনী যদি তাদের পেশাদার আচরণ, নিরপেক্ষ অবস্থান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করে, তবে তারা শুধু নিরাপত্তা বাহিনী নয়, বরং গণতন্ত্রের সহায়ক শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।

সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন একটি দিনের ঘটনা হলেও এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে ভাঙা আস্থার সেতু পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে নির্বাচনকে করতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নির্ভীক। বর্তমান বাস্তবতায় সেনাবাহিনী যদি তাদের শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে তারা নিঃসন্দেহে ভোটারদের আস্থার প্রতীকে পরিণত হবে। আর সেই আস্থাই পারে বাংলাদেশকে একটি অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও অর্থবহ নির্বাচনের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিতে।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক