ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান

আসাদুজ্জামান তপন
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২৬, ০২:০০ পিএম
জিয়াউর রহমান ছিলেন একাধারে মুক্তিযোদ্ধা, সামরিক কর্মকর্তা, রাষ্ট্রনায়ক এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদ।। ছবি : সংগৃহীত

জিয়াউর রহমান ছিলেন সময়ের বাস্তবতা উপলব্ধি করা একজন প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ একাধিক কাঠামোগত ও আদর্শিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। রাষ্ট্রগঠন, বহুদলীয় গণতন্ত্র, জাতীয় পরিচয় ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে তার যুগান্তকারী ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীরভাবে প্রোথিত। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা নন, বরং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম রূপকার।

তিনি ছিলেন একাধারে মুক্তিযোদ্ধা, সামরিক কর্মকর্তা, রাষ্ট্রনায়ক এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। স্বাধীনতা-পরবর্তী অস্থির ও সংকটপূর্ণ সময়ে তার নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, অর্থনীতি, রাজনীতি ও জাতীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে একাধিক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি ব্যতিক্রমী ও প্রভাবশালী নাম।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের বার্তা দেশ ও বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেন। একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তিনি সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, যা তাকে একজন সাহসী ও দায়িত্বশীল সামরিক নেতার পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও প্রশাসনিক দুর্বলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৭৫ সালের পর ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তিনি প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

জিয়াউর রহমানের অন্যতম যুগান্তকারী অবদান হলো একদলীয় ব্যবস্থা থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন। তিনি রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ উন্মুক্ত করেন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন, যা মধ্যপন্থি, জাতীয়তাবাদী ও উন্নয়নকেন্দ্রিক রাজনীতিকে গুরুত্ব দেয়।

জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণার প্রবর্তন করেন, যা ভাষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি ভূখণ্ড, ইতিহাস ও সার্বভৌমত্বকে জাতীয় পরিচয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে। এই ধারণা বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয় নির্মাণে সহায়ক হয়।

তার শাসনামলে তিনি উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দেন। কৃষি উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, খাল খনন কর্মসূচি এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করেন। ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচির মতো উদ্যোগ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বাস্তববাদ ও ভারসাম্যের ধারা প্রবর্তন করেন। তিনি মুসলিম বিশ্ব, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। তার উদ্যোগেই বাংলাদেশ সার্কভুক্ত দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়, যা পরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

গভীর সংকট, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যখন দেশ এগোচ্ছিল, তখন তিনি দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, বাস্তববাদী চিন্তাধারা ও সাহসী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জাতিকে নতুন পথের দিশা দেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ কেবল সাহায্যনির্ভর দেশ হিসেবে নয়, বরং আত্মমর্যাদাশীল ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে স্বীকৃতি লাভ করে। তাই জিয়াউর রহমান কেবল একটি সময়ের নেতা নন, বরং বাংলাদেশের অন্যতম রূপকার হিসেবে ইতিহাসে স্থায়ীও মর্যাদাপূর্ণ আসন লাভ করেছেন।