ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

পবিত্র রমজানের মর্যাদা রক্ষায় দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা অপরিহার্য

সিরাজুল ইসলাম
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম
ছবি- সংগৃহীত

পবিত্র রমজান মাস সংযম, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির বার্তা নিয়ে আসে। এই মাসে মানুষের ভোগের প্রবণতা কমে যাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে এই মূল্যবৃদ্ধি মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। ফলে রমজানের পবিত্রতা ও সামাজিক সৌহার্দ্যের পরিবেশ অনেকাংশেই বিঘ্নিত হয়।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় জনগোষ্ঠী সীমিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মাসিক আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় খাদ্যপণ্যে। রমজান মাসে চাল, ডাল, তেল, ছোলা, চিনি, খেজুর, সবজি, মুরগি ও মাংসের মতো নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে সেই ব্যয়ের চাপ আরও বেড়ে যায়। অনেক পরিবারের জন্য তখন ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোই কঠিন হয়ে পড়ে। ইবাদতের মাসে যেখানে মানসিক প্রশান্তি থাকার কথা, সেখানে বাজারের দুশ্চিন্তা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ব্যাহত করে।

রমজানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ প্রতি বছরই আলোচনায় আসে। চাহিদা বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। মজুতদারি, অতিরিক্ত মুনাফা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বাজার ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে তোলে। পাশাপাশি বাজার তদারকির ঘাটতি ও শাস্তির কার্যকর প্রয়োগ না হওয়ায় এই অনিয়ম বারবার ফিরে আসে। ফলে রমজান এলেই এক ধরনের অদৃশ্য সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার খেসারত দিতে হয় ভোক্তাদের।

এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি রমজানের আগেই পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের সঠিক হিসাব করে প্রয়োজনীয় মজুত নিশ্চিত করে, তাহলে বাজারে অস্থিরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আমদানি প্রক্রিয়াকে সহজ ও সময়োপযোগী করা, শুল্ক ও করনীতিতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় আনা এবং সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুত রাখা জরুরি। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এর পরিসর আরও বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের মানুষও এর সুফল পায়।

বাজার তদারকিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। অভিযান যেন কেবল প্রতীকী না হয়ে নিয়মিত ও ধারাবাহিক হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। যারা মজুতদারি করবে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করবে কিংবা নির্ধারিত মূল্যের বাইরে পণ্য বিক্রি করবে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আইন প্রয়োগে দৃঢ়তা দেখানো না গেলে বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন।

তবে শুধু সরকার বা প্রশাসনের ওপর সব দায় চাপিয়ে দিলে সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না। ব্যবসায়ীদেরও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। রমজান মাসে মুনাফা অর্জন স্বাভাবিক হলেও সেই মুনাফা যেন অযৌক্তিক না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এই মাসে কিছুটা ছাড় দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত ব্যবসায়ীদের সামাজিক দায়িত্ব। এতে একদিকে মানুষের আস্থা বাড়বে, অন্যদিকে ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদি সুনামও প্রতিষ্ঠিত হবে।

ভোক্তাদের সচেতনতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত কেনাকাটা, হঠাৎ মজুত করার প্রবণতা এবং গুজবে কান দেওয়া বাজারে দাম বাড়াতে সহায়ক হয়। সচেতন ভোক্তা হিসেবে এসব আচরণ পরিহার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাজারে কোনো অনিয়ম চোখে পড়লে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা বাজার নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

রমজানের মূল শিক্ষা হলো ধৈর্য, ত্যাগ ও সহমর্মিতা। এই মাসে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমে আসার কথা, কিন্তু যদি দ্রব্যমূল্যের চাপে গরিব মানুষ আরও অসহায় হয়ে পড়ে, তাহলে সেই শিক্ষা বাস্তবায়িত হয় না। ইফতার ও সাহ্‌রির টেবিলে ন্যূনতম স্বস্তি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত লক্ষ্য।

অতএব, পবিত্র রমজানের মর্যাদা রক্ষায় দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা কোনো বিকল্পহীন দায়িত্ব। কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা, কঠোর নজরদারি, নৈতিক ব্যবসাচর্চা এবং সচেতন ভোক্তার সমন্বিত প্রয়াসেই এটি সম্ভব। রমজান যেন মানুষের জন্য কষ্টের নয়, বরং স্বস্তি ও মানবিকতার মাস হয়ে ওঠে—এটাই সময়ের দাবি।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক