অবশেষে বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নানা শঙ্কা, আশঙ্কা ও জল্পনা-কল্পনার মধ্য দিয়ে আয়োজিত এ নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে ছিল বাড়তি নিরাপত্তা প্রস্তুতি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান ও ব্যাপক। নির্বাচন-পরবর্তী সামগ্রিক চিত্র পর্যালোচনা করলে বলা যায়, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ভোটের পরিবেশে একটি স্বস্তি ও স্থিতি এনে দিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।
আমাদের দেশের নির্বাচনি ইতিহাসে সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, জালভোট বা সংঘর্ষের মতো অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের সময় উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। এ বাস্তবতায় ভোটারদের মনে নিরাপত্তা-শঙ্কা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত সেই শঙ্কা প্রশমনে কার্যকর হয়েছে বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন। গ্রাম থেকে শহর বিভিন্ন এলাকায় টহল, চেকপোস্ট ও প্রস্তুত অবস্থান সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই বহু কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নারী, প্রবীণ ও প্রথমবারের ভোটারদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের অনেকেই গণমাধ্যমে বলেছেন, নিরাপত্তা জোরদার থাকায় তারা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পেরেছেন। এই নির্ভয় পরিবেশ তৈরিতে সেনাবাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছে, যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার নয়।
তবে এখানে মনে রাখা জরুরি, সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল সহায়ক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সীমিত। নির্বাচন পরিচালনার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছে নির্বাচন কমিশন ও বেসামরিক প্রশাসন। সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করে সম্ভাব্য সহিংসতা প্রতিরোধ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করেছে। এই সীমারেখা বজায় থাকায় নির্বাচন প্রক্রিয়ার বেসামরিক চরিত্র অক্ষুণ্ন থেকেছে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নিয়ন্ত্রণেও সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফল ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন উত্তেজনা দেখা দিলেও তা বড় আকার ধারণ করেনি। দ্রুত প্রতিরোধ ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ফলে দেশব্যাপী স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যোগাযোগ ও জনজীবনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি। একটি উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রের জন্য এই স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।
তবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে কি না, তার মূল্যায়ন কেবল নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। প্রয়োজন স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ এবং ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি সহিংসতা কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু নির্বাচনকে পূর্ণাঙ্গ অর্থে গ্রহণযোগ্য করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তা সমানভাবে প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত ভূমিকা ইতিবাচক হলে তবেই একটি নির্বাচন সত্যিকার অর্থে সাফল্যমণ্ডিত হয়।
এ নির্বাচনের আরেকটি দিক হলো, জনমনে আস্থার পুনর্গঠন। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন নিয়ে যে অনাস্থা ও বিতর্ক ছিল, তা কাটিয়ে উঠতে হলে ধারাবাহিকভাবে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সেনাবাহিনীর পেশাদার ও সংযত ভূমিকা ভবিষ্যতের জন্য একটি মানদণ্ড তৈরি করেছে। তবে এটি যেন স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচিত না হয়। শক্তিশালী বেসামরিক প্রতিষ্ঠান, কার্যকর পুলিশ প্রশাসন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও ভোটাধিকার প্রয়োগ। সেই অধিকার চর্চার দিনে যদি নাগরিক নিরাপদ বোধ করেন, যদি কেন্দ্রে যেতে ভয় না পান এবং যদি ফলাফল ঘোষণার পরও দেশ শান্ত থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অর্জন। এবারের নির্বাচনে সেই স্বস্তির আবহ অনেকাংশে লক্ষ করা গেছে। এতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা একটি সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন কেবল একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ধারাবাহিক চর্চা। সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে সুষ্ঠু ও স্বস্তির নির্বাচন আয়োজন একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এখন প্রয়োজন এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বাভাবিক উপায়ে নিরাপদ নির্বাচন নিশ্চিত করা। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে সব প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থেকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তবেই জনগণের আস্থা দৃঢ় হবে, রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত হবে এবং নির্বাচনের দিনটি সত্যিকার অর্থে উৎসবে পরিণত হবে।



