ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মতামত

খাল খননের গৌরবগাথা

আসাদুজ্জামান তপন, সাংবাদিক
প্রকাশিত: মার্চ ১৮, ২০২৬, ০১:৪২ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন যে বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো গ্রাম এবং কৃষি। তাই তিনি কৃষক ও গ্রামীণ জনগণের জীবনমান উন্নত করার জন্য বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল তার খাল খনন কর্মসূচি। এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বহু অঞ্চলে জলাবদ্ধতা কমে যায়, সেচ ব্যবস্থার উন্নতি হয় এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খাল খনন কর্মসূচি ছিল তার বৃহত্তর গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি অংশ। যা দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল।

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এখানে অসংখ্য নদী, খাল ও জলাশয় রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক খাল ভরাট হয়ে যায় বা নাব্য হারায়। ফলে বর্ষাকালে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয় এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষি জমিতে সেচের অভাব তৈরি হয়। জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই সমস্যাগুলো সমাধানের পথ পায়।

এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৃত বা ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো পুনরায় খনন করা এবং নতুন খাল তৈরি করা। এর ফলে বর্ষার পানি সহজে নিষ্কাশন হতে পারে এবং শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি কৃষি কাজে ব্যবহার করা যায়। খাল খননের মাধ্যমে কৃষি জমিতে সেচের ব্যবস্থা উন্নত হয়, ফলে ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

এ ছাড়া খাল খননের ফলে পরিবেশগত দিক থেকেও অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। খালগুলোতে পানি জমা থাকায় আশপাশের এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বজায় থাকে এবং মাছ চাষের সুযোগ তৈরি হয়। অনেক জায়গায় খালগুলো স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো, যা গ্রামীণ জীবনযাত্রাকে সহজ করেছিল।

এর মাধ্যমে তিনি শুধু পানি ব্যবস্থাপনাই উন্নত করতে চাননি, বরং গ্রামীণ সমাজকে উন্নয়নের কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। অনেকের মতে এটি একটি বৈপ্লবিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই কর্মসূচির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল স্থানীয় জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ। সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে গ্রামের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে খাল খননের কাজে অংশ নেয়। অনেক জায়গায় মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে, আনন্দ ও উদ্দীপনার সঙ্গে এই কাজে যুক্ত হয়েছিল। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশগ্রহণ করায় এটি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এক ধরনের সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছিল।

একই সঙ্গে এই উদ্যোগ গ্রামীণ জনগণের মধ্যে সহযোগিতা, ঐক্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি করে। অনেক অঞ্চলে মানুষ নিজের এলাকার উন্নয়নের জন্য একসঙ্গে কাজ করার যে সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তা গ্রামীণ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। এ উদ্যোগ জনগণের অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন ধারণাকে শক্তিশালী করেছিল।

শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শুধু কর্মসূচি গ্রহণ করেই দায়িত্ব শেষ করেননি, বরং তিনি নিজে সরাসরি মাঠে নেমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করেছেন। দেশের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও তিনি জনগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাটি কেটেছেন এবং মাথায় মাটির টুকরি বহন করেছেন। একজন রাষ্ট্রপতির এমন সরল ও কর্মমুখী অংশগ্রহণ সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছিল। এতে মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে উন্নয়ন শুধু সরকারের নির্দেশে নয়, বরং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সম্ভব।

তার এই কর্মপ্রবণতা ও নেতৃত্বের ধরন মানুষের হৃদয়ে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। একজন রাষ্ট্রপ্রধান নিজে যখন উন্নয়ন কর্মকা-ে শ্রম দেন, তখন তা জনগণের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও উৎসাহ আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বের ইতিহাসে এমন উদাহরণ খুবই বিরল, যেখানে একজন রাষ্ট্রপতি সাধারণ শ্রমিকের মতো মাঠে নেমে জনগণের সঙ্গে কাজ করেছেন। তাই জিয়াউর রহমানের এই উদ্যোগ শুধু একটি উন্নয়ন কর্মসূচির অংশই ছিল না, বরং নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে আছে।