ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জ্বালানি সংকট নিরসনে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য প্রধানমন্ত্রীর

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি- সংগৃহীত

দেশের স্বার্থে নজিরবিহীন এক ঐক্যের ঘটনা ঘটলো। বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের প্রস্তাবে সায় দিয়েছেন সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের চলমান জ্বালানি তেলের সংকট সমাধানে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করলেন। ডাক দিলেন অভূতপূর্ব এক জাতীয় ঐক্যের। সংকট থেকে উত্তরণে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করার মধ্যে দিয়ে আশান্বিত দেশের মানুষ। 

সংসদকে প্রকৃত অর্থেই কার্যকর করার পাশাপাশি সরকারি দলের আজ্ঞাবহমুক্ত করার চিরায়ত ধারা থেকে বের করার ব্যতিক্রমী উদাহরণ তৈরি করলেন প্রধানমন্ত্রী। নিশ্চিত হলো সরকার ও বিরোধী দলের সহাবস্থান। সংসদীয় রাজনীতিতে সূত্রপাত করলেন নতুন ধারার। পাশাপাশি এমন দৃষ্টান্ত স্থাপনের মধ্যে দিয়ে ‘জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা’-নিজের এই বক্তব্যকে আক্ষরিক অর্থেই বাস্তবিক রূপ দিলেন সরকার প্রধান। জাতীয় সংসদকে ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করলেন। 

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। এর বড় ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশেও। দেশের জ্বালানি চাহিদার ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ আমদানি-নির্ভর। পাকিস্তানের মধ্যস্থতার পরেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সুরাহা না হওয়ায় বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার শুরু হয়। বৈশাখের কাঠফাটা রোদ্দুরে আর তপ্ত হাওয়ায় পেট্রোল পাম্পগুলোর লাইনে অপেক্ষা করাও অসহ্য যন্ত্রণার। এতে সময় অপচয়ের পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষায় অসুস্থ হয়ে পড়েন অনেকেই। জ্বালানি সংকটে আঁচ লাগে তৈরি পোশাক খাতেও। 

গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে উৎপাদন কমে যায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। চাহিদার চেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হলেও বিতরণ কোম্পানিগুলোকে লোডশেডিংয়ের পথে হাঁটতে হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার। জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়তে শুরু করে পেট্রোল পাম্পগুলোতে। যদিও এখনও সংকটের রেশ পুরোপুরি কাটেনি। 

জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন হয়ে উঠে উত্তপ্ত। এরই মধ্যে গত বুধবার (২৩ এপ্রিল) রাতে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের ৬৮ বিধিতে আনা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ‘দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট নিরসনে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে অবিলম্বে সরকারের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের একটি যৌথ কমিটি করার প্রস্তাব দেন। পরদিন বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতির ‘যৌক্তিক সমাধান’ খুঁজে বের করতে ১০ সদস্যের একটি যৌথ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন এবং বিরোধী দলের কাছে পাঁচজন সদস্যের নাম চান। তিনি জানান, প্রস্তাবিত এই কমিটির সভাপতি হবেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং এতে সরকারি ও বিরোধী দল থেকে পাঁচজন করে সদস্য থাকবেন। 

একই দিনে সংসদ অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা দেশে চলমান জ্বালানি সমস্যার সমাধানে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিত কমিটিতে বিরোধী দলের ৫ সদস্যের নাম ঘোষণা করেন। কার্যত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়কে জাতীয় সংকট হিসেবে উল্লেখ করে সেটি মোকাবিলায় সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের মাধ্যমে নজিরবিহীন জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন। দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনার বাস্তবায়নে শহর ও গ্রামের বিদ্যুৎ বণ্টনে সমতা আনার ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলক ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করে সেই বিদ্যুৎ কৃষকের সেচ কাজে ব্যবহারের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। 

এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২১১ আসনে ভূমিধস জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে। ক্ষমতায় এসেই সরকারকে নানান সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। দক্ষতা ও সময়োপযোগী সব পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করছেন। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, 'বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত দুই মাসে ৬০টি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এক অবিস্মরণীয় অর্জন নিশ্চিত করেছে। 

পলিটিকস ইজ দ্য আর্ট অব কম্প্রোমাইজ। এই কম্প্রোমাইজ কোন আপস নয়। এর মাজেজা  সমঝোতা বা মীমাংসা। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার জ্বালানি সংকট কাটাতে জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। প্রমাণ করেছেন 'সবার আগে বাংলাদেশ।' আমরা জানি, রাজনৈতিক দলগুলোর মতাদর্শ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, তাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে এক থাকার কোন বিকল্প নেই। একটি দেশের গণতন্ত্রকে টেকসই করার মাধ্যমে উন্নয়নের গতিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐক্য অপরিহার্য। সংসদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন উভয়ই। ভোটের মালিক জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জন্যও তাদের নিজেদের মধ্যকার এই ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ। 

গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরে নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও দেশের স্বার্থে ঐকমত্যে পৌঁছানো জনগণের আকাঙ্ক্ষা। সরকারপ্রধান এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্তে সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করবে। জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রের মালিকানার শক্তি গড়ে উঠবে। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন বিভাজন নয় দেশের স্থিতিশীলতার প্রশ্নে তাঁর আন্তরিকতা প্রশ্নাতীত। সরকারপ্রধান বিরোধী দলের মতকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চাকে তিনি উৎসাহিত করেছেন বলে মনে করেন ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। 

সংসদ নেতা তারেক রহমান জ্বালানি সংকট নিরসনে বিরোধীদলীয় নেতার উত্থাপিত আলোচনাকে অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করতেও দ্বিধা করেননি। তিনি বলেছেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমরা বিরোধী দলের দেওয়া গঠনমূলক প্রস্তাবকে স্বাগত জানাই। দেশের মানুষের বৃহত্তর স্বার্থে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে আমরা দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে চাই।’ প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়েই প্রতীয়মান হয় তিনি জনস্বার্থের রাজনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। গভীর দেশপ্রেমের শক্তিতে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সহনশীল রাজনীতির চর্চার মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্থিতিশীল ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেওয়া তাঁর পক্ষেই সম্ভব। 

লেখক: পেশাদার গণমাধ্যমকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। 
mamunzi859@gmail.com