মানুষ কেবল একক সত্তা নয়; সে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার সম্মিলিত নির্মাণ। অথচ আমাদের সমাজে “আমি” এত প্রবল হয়ে উঠেছে যে “আমরা” ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত স্বার্থ, গোষ্ঠীগত বিভাজন, মতাদর্শিক হানাহানি কিংবা আত্মকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে যৌথ সামাজিক পরিচয়বোধ আজ এক অনুপস্থিত চর্চা। আমরা একই ভূখণ্ডে বাস করি, কিন্তু একই সামাজিক চেতনায় খুব কমই বাস করি।
পৃথিবীর বহু দেশ কিন্তু এই সংকট অতিক্রম করে নিজেদের জাতীয় শক্তিতে রূপ দিয়েছে। United States-এ “Boiling Pot Culture” কিংবা “Melting Pot” ধারণা বহু জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতিকে এক জাতীয় পরিচয়ের অধীনে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে। পরে “Salad Bowl Culture”-এর ধারণা আরও পরিণতভাবে দেখিয়েছে—ভিন্নতা মুছে না দিয়েও ঐক্য গড়া যায়। সেখানে একজন মানুষ তার নিজস্ব সংস্কৃতি ধরে রেখেও বৃহত্তর আমেরিকান পরিচয়ের অংশ হতে পারে। অর্থাৎ বৈচিত্র্যকে বিভাজন নয়, শক্তি হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে Japan দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে কেবল প্রযুক্তি দিয়ে নয়, এক গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা ও শৃঙ্খলার সংস্কৃতির মাধ্যমে। জাপানের নাগরিক জীবনে ব্যক্তি স্বাধীনতার পাশাপাশি সমষ্টিগত দায়িত্ববোধ অত্যন্ত প্রবল। ট্রেনে, রাস্তায়, দুর্যোগে কিংবা কর্মক্ষেত্রে—সর্বত্র তারা “collective responsibility”-কে গুরুত্ব দেয়। সেখানে সমাজের ক্ষতিকে ব্যক্তিগত ক্ষতি বলেই বিবেচনা করা হয়।
একইভাবে South Korea-এর “Saemaul Undong” বা “New Village Movement” ছিল কেবল একটি উন্নয়ন কর্মসূচি নয়; এটি ছিল সামাজিক সংহতি, আত্মনির্ভরতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের এক অনন্য আন্দোলন। গ্রামকে কেন্দ্র করে মানুষকে শেখানো হয়েছিল—রাষ্ট্র কেবল সরকারের নাম নয়, নাগরিকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণের নামও রাষ্ট্র। ফলে দরিদ্র ও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ কয়েক দশকের ব্যবধানে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম শক্তিতে পরিণত হয়।
আফ্রিকার Rwanda-এর অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯৪ সালের ভয়াবহ গণহত্যার পর দেশটি প্রতিশোধ ও বিভাজনের পথ না বেছে “National Unity and Reconciliation”-এর নীতিকে সামনে আনে। জাতিগত বিভক্তিকে অতিক্রম করে তারা একটি সম্মিলিত জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করে। স্থানীয় কমিউনিটি অংশগ্রহণ, সামাজিক পুনর্মিলন ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সমন্বয়ে রুয়ান্ডা আজ আফ্রিকার অন্যতম শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দ্রুত অগ্রসরমান রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাদের অভিজ্ঞতা দেখায়—গভীর ক্ষতবিক্ষত সমাজও সম্মিলিত চেতনা ও সামাজিক সংহতির মাধ্যমে পুনর্গঠিত হতে পারে।
Singapore বহুজাতিক সমাজ হয়েও কঠোর নাগরিক শৃঙ্খলা, পারস্পরিক সহাবস্থান ও সামাজিক আস্থার ভিত্তিতে একটি কার্যকর রাষ্ট্র কাঠামো গড়েছে। আবার Norway, Sweden কিংবা অন্যান্য নর্ডিক রাষ্ট্রে সামাজিক নিরাপত্তা, আস্থা ও মানবিক মর্যাদার সংস্কৃতি এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে সেখানে নাগরিকেরা রাষ্ট্রকে প্রতিপক্ষ নয়, সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করে।
এছাড়া Canada বহুসংস্কৃতিবাদকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ করে দেখিয়েছে—ভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষও পারস্পরিক সম্মান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী জাতি গঠন করতে পারে। আবার Germany দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিভক্ত ও বিধ্বস্ত বাস্তবতা থেকে উঠে এসে নাগরিক দায়বদ্ধতা, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক আস্থার মাধ্যমে আধুনিক ইউরোপের অন্যতম স্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে Finland-এর শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল জ্ঞানার্জনের উপর নয়, সামাজিক সমতা, সহযোগিতা ও সম্মিলিত উন্নয়নের চেতনার উপরও গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে সেখানে প্রতিযোগিতার চেয়ে অংশগ্রহণমূলক মানবিক সমাজ গঠনের প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান।
কিন্তু আমাদের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে মতভেদ মানেই প্রায়শই বৈরিতা, সমালোচনা মানেই শত্রুতা, আর সংস্কারের প্রস্তাব মানেই সন্দেহ। আমরা যুক্তির চেয়ে হুজ্জতে, সহমর্মিতার চেয়ে প্রতিযোগিতায়, সহযোগিতার চেয়ে আত্মপ্রচারে বেশি অভ্যস্ত। ফলে নতুন কোনো মানবিক বা প্রগতিশীল ধারণা এলেই তা গ্রহণের আগে আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলি। “এতে লাভ কী?”, “এটা বিদেশি সংস্কৃতি”, “এটা বাস্তবসম্মত নয়”—এসব আপত্তি আমাদের মানসিকতার স্থবিরতাকেই প্রকাশ করে।
সমস্যা হলো, আমরা সামাজিক পরিচয়কে এখনও অনেকাংশে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংকীর্ণ খোপে দেখি। অথচ একটি সভ্য সমাজ গড়তে হলে “collective consciousness” বা সম্মিলিত চেতনা অপরিহার্য। কারণ কেবল আইন দিয়ে সভ্যতা তৈরি হয় না; তৈরি হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতির মাধ্যমে।
আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এমন এক সামাজিক পুনর্জাগরণ, যেখানে ভিন্ন মতকে শত্রুতা নয়, সমৃদ্ধির উপাদান হিসেবে দেখা হবে; যেখানে ধর্ম, ভাষা, শ্রেণি কিংবা মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষ বৃহত্তর মানবিক পরিচয়ে একত্র হতে শিখবে। কারণ “unity in diversity” কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি টেকসই সভ্যতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।”
আর Martin Luther King Jr. বলেছিলেন, “ We must learn to live together as brothers or perish together as fools.”
আফ্রিকার মানবতাবাদী দর্শন “Ubuntu”-তেও বলা হয়— “I am because we are.” অর্থাৎ ব্যক্তি অস্তিত্বও মূলত সমষ্টির ভেতরেই পূর্ণতা পায়।
এই কথাগুলোর ভেতরেই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নিহিত আছে। কারণ একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন মানুষ কেবল নিজের জন্য নয়, সবার জন্য ভাবতে শেখে।
প্রশ্ন তাই এখনও রয়ে যায়— আমাদের সমাজে সেই সম্মিলিত চেতনার শঙ্খধ্বনি তুলবে কে? কে শেখাবে, ভিন্নতা বিভাজন নয়—সম্ভাবনা? কে দেখাবে, সামাজিক সংহতি কোনো কল্পনা নয়; বরং উন্নত সভ্যতার সবচেয়ে কার্যকর ভিত্তি?
যতদিন না আমরা ব্যক্তি স্বার্থের ক্ষুদ্র বলয় পেরিয়ে বৃহত্তর সামাজিক মানবতার দিকে অগ্রসর হব, ততদিন উন্নয়নের অট্টালিকা উঠলেও সমাজের ভিত দুর্বলই থেকে যাবে। আর তখন যৌথ সামাজিক পরিচয়বোধ বইয়ের পৃষ্ঠা, বক্তৃতা কিংবা সেমিনারের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকবে—মানুষের বাস্তব জীবনে নয়।
লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক ডিআইজি

