রাষ্ট্র পরিচালনার ভাষা ঐন্দ্রজালিক নয়। নাগরিক আর রাষ্ট্রের ভাষা একরৈখিক। আমাদের প্রত্যাশার ভাষা বিমূর্ত নয়—মূর্ত ও দৃশ্যমান। পিরামিড-নিমগ্নতায় আমরা চাঁদের বুড়ির কুশলী হাতের চরকা কাটা শেষে সকলের প্রীতি-সম্মেলনের সবুজ বৃন্দাবন নির্মাণ করতে চাই—যেখানে পরিশ্রমের সুতোয় বোনা হবে বিশ্বাস, সহমর্মিতা আর সম্মিলিত অগ্রযাত্রার মসৃণ চাদর।
আমাদের নীলাম্বরী আকাশের নিচে নিটোল বাংলাদেশে শুরু হোক সুরের ঐকতান—যেখানে ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠ মিলেমিশে সৃষ্টি করবে এক অভিন্ন সঙ্গতি; মতের বৈচিত্র্য থাকবে, কিন্তু লক্ষ্য হবে এক—মানুষের মর্যাদা, ন্যায় ও অমিত সম্ভাবনার অমেয় দিগন্ত। দৃশ্যমান অগ্রগতি, স্পর্শযোগ্য আস্থা, অংশীদারিত্বের শক্তি আর সৌহার্দ্যের সংবেদনশীলতায় আমরা গড়ে তুলতে চাই এমন এক জনপদ, যেখানে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির দূরত্ব ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে, আর সম্মিলিত প্রয়াসেই প্রতিদিন নতুন করে রচিত হয় আমাদের স্বপ্নের মানচিত্র।
প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক কোনো বিমূর্ত দর্শনের বিষয় নয়; এটি আস্থার এক সামাজিক চুক্তি। ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ জাক রুশো লিখেছিলেন, “The strongest is never strong enough to be always the master, unless he transforms strength into right and obedience into duty.” অর্থাৎ শক্তি তখনই বৈধতা পায়, যখন তা ন্যায়, দায়িত্ব ও জনগণের কল্যাণে নিবেদিত হয়। রাষ্ট্রের সাফল্য তাই নাগরিকের চোখে দৃশ্যমান হতে হয়—বিদ্যালয়ে, হাসপাতালে, আদালতে, কর্মসংস্থানে, নিরাপত্তায় এবং ন্যায্য সুযোগের নিশ্চয়তায়।
বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের এই সত্যটিই মনে করিয়ে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জাপানের পুনরুত্থান কোনো অলৌকিক কাহিনি ছিল না; ছিল শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও সামাজিক আস্থার এক মহাকাব্য। সিঙ্গাপুর প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য নয়, বরং সুশাসন, মেধা ও সততার ভিত্তিতে বিশ্বমানের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। নর্ডিক দেশগুলো—ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক ও সুইডেন—প্রমাণ করেছে যে নাগরিকের প্রতি সম্মান, স্বচ্ছতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারই দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
ফিনল্যান্ডের শিক্ষা-ব্যবস্থা কিংবা ডেনমার্কের সামাজিক আস্থার সংস্কৃতি আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয়—রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রাগারে নয়, বরং নাগরিকের বিশ্বাসে নিহিত। কারণ আস্থা এমন এক সামাজিক পুঁজি, যা অর্থনীতির ভাষায় পরিমাপ করা কঠিন, কিন্তু যার অনুপস্থিতিতে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনান বলেছিলেন, “Good governance is perhaps the single most important factor in eradicating poverty and promoting development.” সুশাসন কেবল প্রশাসনিক দক্ষতা নয়; এটি মানুষের জীবনে প্রত্যক্ষ ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সক্ষমতা। তাই নাগরিকেরা যখন রাস্তা, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা বিচারপ্রাপ্তিতে বাস্তব উন্নয়ন অনুভব করেন, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের আস্থা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের ইতিহাসও সম্মিলিত প্রয়াসের শক্তির এক উজ্জ্বল দলিল। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবিলা কিংবা সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি—সব ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি জনগণ ও প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত শক্তি কীভাবে অসাধ্যকে সাধন করতে পারে। আমাদের কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, প্রবাসী, নারী ও তরুণ সমাজ—সকলেই এই অগ্রযাত্রার সহযাত্রী।
কিন্তু অগ্রগতির পথ কখনো সরলরেখার মতো নয়। বৈশ্বিক বাস্তবতায় আমরা জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত বৈষম্য, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিভাজনের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ কারণেই আমাদের প্রয়োজন এমন এক অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রদর্শন, যেখানে মতের ভিন্নতা সংঘাতের কারণ নয়, বরং সমৃদ্ধির উৎস হয়ে ওঠে। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা যথার্থই বলেছিলেন, “It always seems impossible until it's done.” ইতিহাসের প্রতিটি বড় অর্জনের শুরু হয়েছিল সম্মিলিত বিশ্বাসের ক্ষুদ্র বীজ থেকে।
আজকের বিশ্বে উন্নয়নের নতুন অভিধান রচিত হচ্ছে অংশীদারিত্বের ভাষায়। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) থেকে শুরু করে ইউরোপীয় সামাজিক মডেল কিংবা পূর্ব এশিয়ার উন্নয়ন-অভিজ্ঞতা—সবখানেই একটি বিষয় অভিন্ন: রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই চিরন্তন প্রার্থনা—“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির”—আজও আমাদের পথ দেখায়। ভয়মুক্ত, মর্যাদাবান ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন কোনো কাব্যিক অলংকার নয়; এটি একটি বাস্তব রাষ্ট্রনৈতিক লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন আস্থার সেতুবন্ধন, জবাবদিহির সংস্কৃতি এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ।
রাষ্ট্র পরিচালনার ভাষা শেষ পর্যন্ত মানুষের ভাষাই। সেখানে প্রতিশ্রুতির চেয়ে ফলাফল অধিক গুরুত্বপূর্ণ, বাগাড়ম্বরের চেয়ে কার্যকারিতা অধিক মূল্যবান, আর বিভেদের চেয়ে ঐক্য অধিক শক্তিশালী। আমাদের সামনে তাই এক মহৎ আহ্বান—প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান কমিয়ে এমন এক বাংলাদেশ নির্মাণ করা, যেখানে উন্নয়ন হবে দৃশ্যমান, ন্যায়বিচার হবে প্রাপ্তিযোগ্য, সুযোগ হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানবিক মর্যাদা হবে সকল নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু।
সেদিন হয়তো আমরা সত্যিই দেখতে পাব—চাঁদের বুড়ির চরকায় কাটা সুতোয় বোনা সেই মসৃণ চাদর, যার প্রতিটি বুননে থাকবে শ্রমের গৌরব, বিশ্বাসের দীপ্তি, সহমর্মিতার উষ্ণতা এবং এক অদম্য জাতির সম্মিলিত অভিযাত্রার অনির্বাণ আলোকরেখা।
লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক ডিআইজি

