জাতীয় পরিচয় নির্ধারণে শুধু ধর্মীয় পরিচয় যথেষ্ট নয়; ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, জাতীয় পরিচয় কেবল ধর্ম দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের অভিন্ন পরিচয় ‘বাংলাদেশি’।
বুধবার (২২ জুলাই) সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ১৯৪৭ সালে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও সময়ের সঙ্গে ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন সামনে চলে আসে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, একটি জাতির পরিচয় কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির চূড়ান্ত সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা ও সামরিক প্রতিরোধ জাতিকে যুদ্ধের পথে এগিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণা জুগিয়েছিল। পরবর্তীতে সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে।
তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রেক্ষাপটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন প্রবর্তন করেন, যা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতীয় পরিচয়ের ধারণাকে সামনে নিয়ে আসে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মূল দর্শন হলো বাংলাদেশের সকল নাগরিকের পরিচয় বাংলাদেশি। এই পরিচয় কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, ভাষা, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী বা সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের সব ধর্মাবলম্বী, ভাষাভাষী ও নৃগোষ্ঠীর মানুষের বৈচিত্র্যকে ধারণ করে।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক দর্শন নয়; এটি বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতীয় পরিচয়ের ধারণা। এই দর্শনের মাধ্যমে দেশপ্রেম, জাতীয় ঐক্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব। তিনি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম।
ইউট্যাব জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউট্যাব জবি শাখার সাধারণ সম্পাদক ও বহিরাঙ্গন কার্যক্রম পরিচালক অধ্যাপক ড. নাছির আহমাদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ-উল আজম সওদাগর এবং সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক মোস্তাফিজ আহমেদ।
সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে স্থাপিত ঘোষণাফলকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী। পরে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ সংলগ্ন এলাকায় দুটি বৃক্ষরোপণ করেন তিনি।

