× UCB Sticker Card
সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম

ব্যয় সাশ্রয়ে প্রধানমন্ত্রীর নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীত

রাষ্ট্রচিন্তা ও শাসনপদ্ধতিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা যখন স্লোগান অতিক্রম করে নীতিগত সিদ্ধান্তে রূপ নেয়, তখন তা জনমনে এক ধরনের স্বস্তি ও আশার সঞ্চার করে। সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে তেমনি এক যুগান্তকারী ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছি আমরা। রাষ্ট্রের সার্বিক ব্যয় সংকোচন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং পুলিশ বাহিনীর জনবল ও যানবাহনের কার্যকর ব্যবহারের লক্ষ্যে ১৮ জন মন্ত্রীর প্রটেকশন এসকর্ট বা বিশেষ নিরাপত্তা বহর প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনিক ভারসাম্য ও গুরুত্ব বিবেচনায় একজন উপদেষ্টা এবং ছয়জন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর ক্ষেত্রে এই সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ জুলাই থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের ব্যাপ্তি শুধু নির্দিষ্ট কিছু গাড়ির বহর কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর নেপথ্যে রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনায় এক নতুন সংস্কৃতির সূচনা। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই যে কৃচ্ছ্রসাধনের পথ প্রদর্শন করে আসছেন, এটি তারই একটি শক্তিশালী ধারাবাহিকতা।

যেকোনো বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার বা কৃচ্ছ্রসাধন নীতি সফল করতে হলে শীর্ষস্থান থেকে তার উদাহরণ তৈরি করতে হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নিজের নিরাপত্তা বহরে বহরের গাড়ির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছেন। আরও বড় বিষয় হলো, তিনি সড়কে চলাচলের সময় বিশেষ কোনো বাড়তি ট্রাফিক সুবিধা গ্রহণ করছেন না। আমরা সচরাচর দেখে অভ্যস্ত—কোনো ভিভিআইপি মুভমেন্টের সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাধারণ মানুষকে ভিআইপি কালচারের যাতাকলে পিষ্ট হতে হয়, অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকে, কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না।

কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন সাধারণ মানুষের মতো ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকছেন, সিগন্যাল ছাড়লে তাঁর গাড়ি এগোচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি খুব সাধারণ আচরণ মনে হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। প্রধানমন্ত্রী নিজে যখন প্রথাগত 'ভিআইপি প্রটোকল' ভাঙতে পারেন, তখন মন্ত্রীদের এসকর্ট প্রত্যাহার কেবল একটি দাপ্তরিক আদেশ থাকে না, তা এক নৈতিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়।

আমাদের বুঝতে হবে, একজন মন্ত্রীর প্রটেকশন এসকর্টের পেছনে রাষ্ট্রের কতটা সম্পদ অপচয় হতো। সাধারণত একজন মন্ত্রীর নিরাপত্তা বহরে একজন সাব-ইনস্পেক্টর (এসআই) এবং চারজন কনস্টেবলের একটি সশস্ত্র দল থাকে। তাঁদের বহন করার জন্য ব্যবহৃত হয় পুলিশের একটি সুনির্দিষ্ট পিকআপ ভ্যান। এই গাড়ির জ্বালানি খরচ, মেনটেন্যান্স এবং উক্ত কর্মকর্তা ও সদস্যদের বেতন-ভাতা, ঝুঁকি ভাতা সরাসরি সরকারি কোষাগার থেকে মেটানো হয়।

১৮ জন মন্ত্রীর এসকর্ট প্রত্যাহারের ফলে প্রতিদিন রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় হবে, যার বাৎসরিক অর্থনৈতিক মূল্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু অর্থ সাশ্রয়ই নয়, ডিএমপি সূত্রে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সম্পূর্ণ প্রটেকশন কিন্তু প্রত্যাহার করা হয়নি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রীদের সঙ্গে নির্ধারিত গানম্যান, বাসভবনের প্রহরী এবং ঢাকার বাইরে কোনো জেলা সফরের সময় প্রয়োজনীয় পুলিশ প্রটেকশন সুবিধা ঠিকই বহাল থাকবে। অর্থাৎ, দায়িত্ব পালনে তাঁদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে না, অথচ রাস্তায় ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রদর্শন এবং বাড়তি অপচয় বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী জনবল ও যানবাহন সংকটে ভুগছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কনস্টেবল ও কর্মকর্তার ঘাটতি একটি স্থায়ী সমস্যা।

ডজন ডজন পুলিশ কর্মকর্তা ও গাড়ি যদি কেবল ভিআইপিদের পেছনে সার্বক্ষণিক এসকর্ট হিসেবে ব্যস্ত থাকে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দেবে কে?

১৮ জন মন্ত্রীর বহর থেকে অবমুক্ত হওয়া ১৮টি পিকআপ ভ্যান এবং প্রায় ৯০ জন প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্যকে এখন থানা পর্যায়ের টহল, অপরাধ দমন কিংবা শহরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত করা সম্ভব হবে।

পুলিশকে ব্যক্তিসেবক বা ভিআইপিদের ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে না দেখে জনগণের সেবক হিসেবে রূপান্তরের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা রাখবে।

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট ও মুদ্রাস্ফীতি এক আন্তর্জাতিক বাস্তবতা। বিশ্ববাজারের এই অস্থিতিশীলতা থেকে বাংলাদেশও বিচ্ছিন্ন নয়। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। যখন সাধারণ মানুষকে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিসেব করে চলতে হচ্ছে, তখন রাষ্ট্রনায়কদের বিলাসী প্রটোকল বজায় রাখা শুধু নীতিগতভাবেই ভুল নয়, বরং তা জনগণের সাথে এক ধরনের পরিহাস।

সরকার যখন জ্বালানি ও সরকারি খরচ কমানোর আহ্বান জানায়, তখন সাধারণ নাগরিক দেখতে চায়—সরকার পরিচালনায় যুক্ত ব্যক্তিরা নিজেরা কতটা কৃচ্ছ্রসাধন করছেন। এই জায়গাটিতে ১৮ মন্ত্রীর এসকর্ট প্রত্যাহার সরকারের সদিচ্ছার প্রতীক হিসেবে কাজ করবে। এটি প্রমাণ করে, সরকার কেবল জনগণকে উপদেশ দিচ্ছে না, বরং নিজের ঘর থেকেই ব্যয় সংকোচনের কাজ শুরু করেছে।

বাংলাদেশে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং 'ভিআইপি সাইরেন'-এর দাপট দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকদের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়ে আসছিল। রাস্তায় হুটার বাজিয়ে প্রটোকল প্রটোকল খেলা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

‘প্রজা সাধারণ যে রাষ্ট্রে ট্যাক্স প্রদান করে, সেই রাষ্ট্রে জনপ্রতিনিধিদের কাজ হওয়া উচিত জনগণের সেবক হওয়া, শাসক নয়।’

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের এই সিদ্ধান্ত ভিআইপি কালচারের মানসিকতায় বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। একজন সাধারণ নাগরিক যখন দেখেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে ট্রাফিক সিগন্যালে অপেক্ষা করছেন এবং মন্ত্রীদের গাড়ির পেছনে পুলিশের গাড়ি বিকট শব্দে হুটার বাজাচ্ছে না, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর আস্থা ও নাগরিক শ্রদ্ধাবোধ বহুলাংশে বেড়ে যায়।

যেকোনো প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে। তবে এই সিদ্ধান্ত ধরে রাখা এবং এর ব্যাপ্তি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে:

তবে সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর তা যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। কোনো মন্ত্রী যেন অনানুষ্ঠানিকভাবে বা ভিন্ন উপায়ে বাড়তি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা না করেন, সেদিকে প্রশাসনিক নজরদারি রাখতে হবে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই পরিবর্তন সরকারি আমলাতন্ত্রেও পৌঁছাতে হবে। আমলাদের বাড়তি নিরাপত্তা ও গাড়ির অনাবশ্যক ব্যবহার কমাতেও একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

এই ধরনের সিদ্ধান্ত যেন সাময়িক রাজনৈতিক চমক না হয়। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও যেন ভিআইপি কালচারের এই বর্জন অব্যাহত থাকে।

পরিশেষে বলতে চাই,১৮ জন মন্ত্রীর পুলিশি এসকর্ট প্রত্যাহার এবং প্রধানমন্ত্রীর ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলা—এই দুটি ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। এটি কেবল জ্বালানি সংকট বা অর্থ সাশ্রয়ের হিসাব নয়; এর পেছনে রয়েছে শাসনব্যবস্থাকে জনমুখী করার দূরদর্শী দর্শন।

জনগণের টাকায় পরিচালিত রাষ্ট্রে জনপ্রতিনিধিদের এই সাধারণীকরণ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোক আরও শক্তিশালী করবে। সরকারের এই ইতিবাচক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে এবং এর পাশাপাশি প্রশাসনিক অন্যান্য খাতেও যদি একইভাবে স্বচ্ছতা ও কৃচ্ছ্রসাধন নিশ্চিত করা যায়, তবে একটি বৈষম্যহীন, দায়িত্বশীল ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন করা আর দূরবর্তী স্বপ্ন থাকবে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে কীভাবে অল্প সময়ে বড় ধরনের মানসিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তন আনা যায়, এই সিদ্ধান্ত তার এক অনন্য দলিল হয়ে থাকবে।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!