আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়, এমনকি সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক অংশীদার দেশগুলোর তালিকাতেও নেই। তবু ভারতের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ অতিথি হিসেবে সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, ভারতের আমন্ত্রণপত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে এবং তা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনাটিকে তাই কেবল ‘একটি আমন্ত্রণ’ হিসেবে দেখলে এর কূটনৈতিক তাৎপর্যকে খাটো করা হবে। বরং এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা, দিল্লির আঞ্চলিক কৌশল এবং ঢাকার পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির সম্ভাব্য সমীকরণ—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রথমত, ব্রিকস এখন আর কেবল পাঁচটি উদীয়মান অর্থনীতির পুরোনো জোট নয়। এর সদস্যসংখ্যা বেড়েছে, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিসর বিস্তৃত হয়েছে এবং বিশ্বব্যবস্থায় এর গুরুত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি নতুন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অন্তর্ভুক্তি ব্রিকসকে বৈশ্বিক দক্ষিণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে।
এই বাস্তবতায় ভারতের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ সদস্য না হলেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ, আঞ্চলিক বাণিজ্য, সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি, যোগাযোগ এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলের দিক থেকে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে।
দিল্লি নিশ্চয়ই জানে—দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক কৌশল পূর্ণতা পেতে পারে না। আর ঢাকার জন্যও বাস্তবতা হলো, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে আবেগ, অভিমান বা রাজনৈতিক প্রচারণার সরলীকৃত কাঠামোয় নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক মর্যাদা এবং কৌশলগত ভারসাম্যের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। সুতরাং, এই আমন্ত্রণকে দুই দেশের সম্পর্কের একটি নতুন কূটনৈতিক জানালা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রগুলো সাধারণত কথার চেয়ে কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বেশি বার্তা দেয়। একজন প্রধানমন্ত্রীকে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো সেই ধরনের একটি বার্তা।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা বহুমাত্রিক। সীমান্ত নিরাপত্তা, নদীর পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সংযোগ, বঙ্গোপসাগর এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের জন্যও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই সম্পর্ক হতে হবে সমতার ভিত্তিতে। বন্ধুত্ব মানে আত্মসমর্পণ নয়, আবার জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অর্থও প্রতিবেশীর সঙ্গে স্থায়ী বিরোধে জড়িয়ে পড়া নয়। এখানেই নতুন বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে একদিকে যেমন ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা, জাতীয় স্বার্থ এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ভারতের আমন্ত্রণ তাই বাংলাদেশের জন্য যেমন সম্মানের, তেমনি এটি একটি দায়িত্বও।
যদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লি সফর করেন, তাহলে ব্রিকস সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক পরিসরের বাইরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সাইডলাইনে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের বৈঠক প্রায়ই আনুষ্ঠানিক আলোচনার চেয়েও বেশি ফলপ্রসূ হয়।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অমীমাংসিত বিষয় কম নয়। সীমান্তে প্রাণহানি, পানি বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য, পণ্য পরিবহন, ভিসা, জ্বালানি, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন—সবকিছুই আলোচনার টেবিলে থাকা উচিত। একটি পরিণত কূটনীতি কখনোই কঠিন বিষয় এড়িয়ে যায় না। বরং কঠিন বিষয়গুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। দুই দেশের সম্পর্ককে যদি কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব সমস্যা সমাধানের দিকে নেওয়া যায়, তাহলে এই আমন্ত্রণ একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়। কিন্তু ব্রিকসের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগের সম্ভাবনা যথেষ্ট বিস্তৃত।
ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্রগুলো বিশ্বের বড় অর্থনীতি, বড় বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যশক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন বাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন ব্রিকসের মতো প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো ঢাকার জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনক হতে পারে। তবে এখানেও সতর্কতা জরুরি।
বাংলাদেশকে কোনো ভূরাজনৈতিক শিবিরের অন্ধ অনুসারী হওয়া যাবে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল শক্তি হওয়া উচিত ভারসাম্য। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং রাশিয়াসহ সব অংশীদারের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশের কূটনীতি হওয়া উচিত—‘কারও বিরুদ্ধে নয়, সবার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।’
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে সহযোগিতার পাশাপাশি অবিশ্বাসের অধ্যায়ও রয়েছে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক গভীর হলেও রাজনৈতিক সম্পর্ক সবসময় একই গতিতে এগোয়নি।
যে কোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে একতরফা প্রত্যাশা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক টেকসই করতে হলে উভয় পক্ষকেই পরস্পরের উদ্বেগ, স্বার্থ এবং জনগণের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে হয়।
বাংলাদেশের জনগণ চায় ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখুক। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে। সীমান্তে নিরাপত্তা, পানি, বাণিজ্য কিংবা রাজনৈতিক যোগাযোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণের আস্থা অর্জন করা জরুরি।
একইভাবে ভারতের জনগণও একটি স্থিতিশীল, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক বাংলাদেশ চায়। এই বাস্তবতাই দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত্তি। সুতরাং, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর কেবল দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক নয়; এটি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন আস্থার কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার একটি সুযোগ।
প্রথমত, আমন্ত্রণকে যথাযথ মর্যাদায় গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে সফরটি যেন কেবল ছবি তোলা ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে একটি সুসংগঠিত আলোচ্যসূচি তৈরি করতে হবে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা, নদীর পানি, জ্বালানি, যোগাযোগ, ভিসা, শ্রমবাজার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা—প্রতিটি বিষয়কে বাস্তবসম্মতভাবে আলোচনায় আনতে হবে।
তৃতীয়ত, ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগে পরিণত করা দরকার। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আলোচনার পাশাপাশি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো যেতে পারে।
চতুর্থত, বাংলাদেশকে নিজের পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। ভারতকে বন্ধু হিসেবে সম্মান করা যেমন জরুরি, তেমনি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দৃঢ় থাকাও জরুরি। কারণ শক্তিশালী সম্পর্কের ভিত্তি অন্ধ আনুগত্য নয়—পারস্পরিক সম্মান।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ। কিন্তু সুযোগকে সাফল্যে পরিণত করতে হলে দক্ষ প্রস্তুতি, বাস্তববাদী কূটনীতি এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করতে পারে—বাংলাদেশ তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হবে মর্যাদাপূর্ণ; বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতা চায়, কিন্তু সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে নয়; বাংলাদেশ বৈশ্বিক দক্ষিণের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চায়, কিন্তু কোনো একক শক্তির ছায়ায় দাঁড়িয়ে নয়।
দিল্লির আমন্ত্রণ তাই কেবল ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া একটি আমন্ত্রণপত্র নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বেরও একটি স্বীকৃতি। এখন দায়িত্ব ঢাকার—এই সুযোগকে কীভাবে কাজে লাগানো হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ যদি আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ ও জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতি পরিচালনা করতে পারে, তাহলে সেপ্টেম্বরের নয়াদিল্লি সফর কেবল একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের ঘটনা হয়ে থাকবে না। এটি হতে পারে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা, ব্রিকস বিশ্বের সঙ্গে ঢাকার নতুন যোগাযোগের দরজা এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কূটনীতিতে কখনো কখনো একটি আমন্ত্রণই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
লেখক: আহসান হাবিব বরুন, সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন