‘ক্যামনে চলি বাপ, আর পারি না। জিনিস-পত্তরের যে দাম। আগের মতো মানুষ আর ভিখও দেয় না’- কথাগুলো বলেন ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা। কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা ঢাকার মগবাজারে থেকে বিভিন্ন বাসায় ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করেন। গত বৃহস্পতিবার সকালে ভিক্ষা করতে এসে তিনি বলেন, ‘বাবা, মানষে আর ভিখও দেয় না! যা পাই তা দিয়ে পেট চলে না বাপ!’ বলেই কেঁদে ফেলেন।
তিনি বলেন, তিন বছর আগে দিনে দেড় হাজার-দুই হাজার টাকাও ভিক্ষা পেতেন। মগবাজারে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। এখন দিনে ৫০০ টাকাও তার আয় নেই। তার ওপরে ওষুধ ছাড়া জীবন বাঁচে না। যে কারণে বাসা ছেড়ে দিয়ে এখন থাকেন অন্যের ঘরের বারান্দায়। ওষুধ আর খাবার কিনতে আয় দিয়ে কুলিয়ে উঠছে না বলেন তিনি। একই অবস্থা ঢাকার মধ্যম শ্রেণির সব মানুষের।
ঢাকা বাজারে খুচরা পর্যায়ে সবধরনের মাছ, সবজি ও ডিমের দাম বেড়েছে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে সবজি ও মাছের।
ব্যবসায়ীরা বলেন, প্রথমত বন্যায় সবজির উৎপাদন কমেছে, যা আছে সেসব পণ্যের সরবরাহে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। যার কারণে উচ্চমূল্য দিতে হচ্ছে ভোক্তাদের। গত দুই মাসে কয়েক দফায় টানা বৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতিতে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ভোক্তাপর্যায়ে সবধরনের মাছের দাম কেজিতে অন্তত ৮০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। ডিমের হালি ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি এবং সবজির দাম প্রতি কেজিতে অন্তত ৩০ টাকা বেড়েছে। গতকাল মগবাজার, কারওয়ান বাজার এবং মালিবাগ এবং শান্তিনগর বাজার ঘুরে এই চিত্র দেখা যায়।
কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ সর্বোচ্চ ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ২০ দিন আগেরও দাম ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকা। দাম বৃদ্ধি বিষয়ে ব্যবসায়ীরা বলেন, অতিবৃষ্টিতে কৃষকের জমিতে মরিচের গাছ মারা গেছে।
কিচেন মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, পাঙ্গাশ মাছের বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে কেজি ২৪০ টাকা। গত বছরে ৯০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হলেও এখন দ্বিগুণ দাম। চাষের কই মাছ ২৬০ এবং শিং-মাগুর ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা পর্যায়ে ডিমের হালি ৪৮ টাকা; যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দাম। একই সঙ্গে বেড়েছে আলু, দেশি পেঁয়াজ এবং সুগন্ধি ও চিকন চালের দাম। তবে চিনি, ভোজ্যতেল এবং ডালের দাম বাড়েনি।
চালের দাম সম্পর্কে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের চাল ব্যবসায়ী নোয়াখালী রাইস এজেন্সির মালিক মো. বেলাল বলেন, ‘চিকন ও সুগন্ধি চালের দাম অনেক বেড়েছে, কিন্তু মোটা চালের দাম বাড়েনি।’
ঢাকার মগবাজারে রাজ্জাক স্টোরের মালিক মেহেদি হাসান বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫৫ টাকা।’ তবে রাজধানীর কোনো কোনো বাজারে পেঁয়াজের কেজি ৬০ টাকা দরেও বিক্রি হচ্ছে বলেন তিনি। তবে সপ্তাহখানেক আগেও খুচরা পর্যায়ে ৩৫ থেকে ৪৫ টাকায় এক কেজি পেঁয়াজ কেনা যেত।
বাজারে এখন ডিমের দাম চড়া। ফার্মের মুরগির বাদামি রঙের এক ডজন ডিম ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার দোকানে আরও বেশি দাম রাখা হচ্ছে। কিচেন মার্কেটের ডিম ব্যবসায়ী মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘বর্ষাকালে ডিমের উৎপাদন কমে, যার কারণে দামে বাড়তি থাকে। তবে খুচরা পর্যায়ে ডিমের অনেক বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে, যা অন্যায় করছেন বিক্রেতারা।’
বাড়তি রয়েছে মুরগির দামও। বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ২০০ টাকা এবং ধরনভেদে সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। তিন সপ্তাহ আগে এ দাম কেজিতে আরও ৩০-৪০ টাকা কম ছিল। রুই, তেলাপিয়া, পাঙ্গাশ মাছের দামও এক মাস আগের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে রুই মাছের দাম কেজিতে ৫০ টাকার মতো বেড়েছে।
গত দুই মাসে কয়েক দফায় টানা বৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতি প্রায় সবধরনের সবজির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজারে গেলে ৮০ টাকার নিচে তেমন কোনো সবজি কেনা যায় না। বেশকিছু সবজির দাম ১০০ টাকার ওপরে। এক মাসের ব্যবধানে সবজিভেদে কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
মগবাজারে গতকাল প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হয়েছে ২৪০ থেকে ২৮০ টাকায়। অন্যান্য সবজির মধ্যে গতকাল প্রতি কেজি বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা; বরবটি, চিচিঙ্গা, ঝিঙে, ঢ্যাঁড়স, করলা প্রভৃতি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন