ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সর্বশেষ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও বিগত দিনে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে তা করা সম্ভব হয়নি। তবে এবার সেই দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে আগামী ঈদুল আজহার পর সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি।
দলীয় সূত্র বলছে, ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপি মোট ছয়টি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করেছে। এবারের কাউন্সিলকে ঘিরে দলটির ভেতরে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর একটি পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিল আয়োজনের সুযোগ পাওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যেও প্রত্যাশা অনেক বেশি।
দলের শীর্ষ নেতৃত্বেও এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকার সময় গঠনতন্ত্রের ৭(গ) ধারা অনুযায়ী প্রায় আট বছর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তে তাকে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে ২০১৬ সালের কাউন্সিলে নির্বাচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখনো মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের কাউন্সিলে স্থায়ী কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদে নতুন নেতৃত্ব আসছে। নতুন কাউন্সিলকে সামনে রেখে দলের স্থায়ী কমিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। দলীয় নেতারা বলছেন, এবারের কাউন্সিলে যোগ্য, ত্যাগী এবং পরীক্ষিত নেতারা অগ্রাধিকার পাবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা পদগুলোও পূরণ করা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শিগগিরই কাউন্সিলের পথনকশা ঘোষণা করা হবে। অতীতের চেয়ে এবারের কাউন্সিল নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। কারণ বিগত ফ্যাসিবাদের সময় আমাদের সাংগঠনিক কাজে নানা প্রতিকূলতা ছিল। তাই কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হতো সাদামাটা। আশা করি, এবারের কাউন্সিল হবে উৎসবমুখর। এতে দলের সর্বস্তরে আসবে নতুন নেতৃত্ব।’
২০১৬ সালের কাউন্সিলের আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯ জন। তবে বিভিন্ন কারণে পূর্ণসংখ্যা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত এই কমিটিতে সদস্য ছিলেন ১৬ জন। ওই সময় নতুন করে যুক্ত হন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। পরবর্তীতে নানা পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে কমিটিতে কিছু পদ শূন্য রয়েছে।
বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান এবং পদাধিকারবলে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়া আছেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
তবে দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা শারীরিক কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে রয়েছেন। ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ, অন্যদিকে মির্জা আব্বাসও চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই কাউন্সিল দলের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। একাধিক জেলা বিএনপি নেতার ভাষ্য, ‘দল দীর্ঘদিন ধরে কঠিন সময় পার করেছে। এখন একটি শক্তিশালী ও কার্যকর নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। আমরা চাই, এমন নেতৃত্ব আসুক যারা মাঠে সক্রিয় থাকবে এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখবে।’
আরেকজন তরুণ নেতা বলেন, ‘এই কাউন্সিল শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং দলের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরি করা দরকার।’
দলের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—নতুন কাউন্সিলে কি বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও পুনরায় নির্বাচিত হতে হবে, যদিও তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এক বছরও পূর্ণ হয়নি? একই প্রশ্ন প্রযোজ্য মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ক্ষেত্রেও।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কাউন্সিলই দলের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ফোরাম, যেখানে চেয়ারম্যান, মহাসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো কাউন্সিলরদের ভোটে বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয়। ফলে সময়কাল পূর্ণ হোক বা না হোক, কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলে দলীয় শীর্ষ পদগুলো নতুন করে অনুমোদন বা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বৈধতা পায়—এটাই সংগঠনের প্রচলিত নিয়ম।
একইভাবে, মহাসচিব পদেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। যদিও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিন ধরে এই দায়িত্ব পালন করছেন এবং দলের ভেতরে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তবুও নতুন কাউন্সিলে তাকেও পুনরায় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পেতে হবে। গঠনতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে।
দলীয় সূত্র বলছে, অনেক সময় কাউন্সিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই সর্বসম্মতভাবে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। আবার কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনও হতে পারে, যদি একাধিক প্রার্থী সামনে আসেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে শীর্ষ পদগুলোতে বড় ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতে, ‘কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন করে নির্বাচিত হওয়া মানে নেতৃত্বের প্রতি দলের সর্বস্তরের সমর্থন পুনরায় নিশ্চিত করা। এতে নেতাদের দায়িত্বও আরও বেড়ে যায়।’ তাদের ভাষায়, এই প্রক্রিয়া দলকে আরও সুসংগঠিত ও গতিশীল করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিএনপির সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল ঘিরে দলটির ভেতরে যেমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন