ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ঢাকা দক্ষিণ যুবদলের সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় কে এই সোহাগ ভূঁইয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মে ১৮, ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম
মো. সোহাগ ভূঁইয়া। ছবি : সংগৃহীত

রাজপথের আন্দোলন, একের পর এক মামলা, রিমান্ডের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক সক্রিয়তা সব মিলিয়ে বিএনপির ছাত্ররাজনীতিতে আলোচিত এক নাম মো. সোহাগ ভূঁইয়া। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন জোর আলোচনা, আসন্ন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক পদে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন এই ছাত্রনেতা।

দলীয় সূত্র, ছাত্রদল ও যুবদলের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা সোহাগ ভূঁইয়া প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আস্থাভাজন তরুণ নেতাদের একজন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। বিশেষ করে সরকারবিরোধী আন্দোলন, বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং সাংগঠনিক তৎপরতায় ধারাবাহিক উপস্থিতি তাকে যুবদলের গুরুত্বপূর্ণ পদের আলোচনায় নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কুমিল্লার সন্তান সোহাগ ভূঁইয়ার রাজনৈতিক উত্থান মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতি ঘিরে। বিএনপির বিগত দিনে ২০১৩-১৪ সালে হরতাল অবরোধ কর্মসূচিতে তার রাজপথের অবদান ছিল ব্যাপক যার কারণে সে আলোচনায় আসেন। শাহজাহানপুর থানা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তার সাংগঠনিক পরিচিতি তৈরি হয়। এরপর তিনি ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সর্বশেষ সভাপতি নির্বাচিত হন। ছাত্রদলের ঢাকা মহানগরের পুনর্গঠিত কমিটিগুলোতে ধারাবাহিকভাবে তার অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে বলে দলীয় নেতারা মনে করেন।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঘোষিত ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের আংশিক কমিটিতে সভাপতি হিসেবে সোহাগ ভূঁইয়ার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটি ঘোষণার পর থেকেই রাজধানীর ছাত্ররাজনীতিতে তার প্রভাব আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে সোহাগ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ৭৬টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়। আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন সময় তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তার সহকর্মীরা। বিশেষ করে রাজধানীতে বিএনপি ও ছাত্রদলের অবরোধ, বিক্ষোভ ও মিছিলকেন্দ্রিক কর্মসূচিগুলোতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তিনি ‘মাঠের কর্মী’ হিসেবে পরিচিতি পান।

২০১৮ সালে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বহুল আলোচিত পুলিশের সাথে সংঘর্ষের সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোহাগকে গ্রেপ্তার করতে তার পরিবারের উপর পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নির্মম নির্যাতন নিপীড়ন করেন। তাকে গ্রেপ্তার করতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তার পরিবারের ২১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গ্রেপ্তার পরবর্তী ৫ দিন তাকে গুম করে রাখা হয়, ডিবি কার্যালয়ে রিমান্ডে থাকার একটি অভিজ্ঞতা সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় আসে। সেসময়ের এক সহযোদ্ধা ছাত্রদল নেতা তার স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেন, কীভাবে দিনের পর দিন আতঙ্ক, মানসিক চাপ ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে সময় কাটাতে হয়েছিল তাদের।

তিনি দাবি করেন, একদিন সকালে সোহাগকে আলাদা করে নিয়ে গেলে সহবন্দিরা আশঙ্কা করেছিলেন তিনি হয়তো আর জীবিত ফিরবেন না। পরে অসুস্থ অবস্থায় তাকে ফেরত আনা হয়। সেই ঘটনার পর অনেক নেতাকর্মীর কাছে ‘ত্যাগী ও নির্যাতিত ছাত্রনেতা’ হিসেবেই পরিচিতি আরও জোরালো হয়।

দলীয় সূত্র মতে জানা যায়, সোহাগ ভূঁইয়া ১০ বারেরও অধিক দীর্ঘ সময় কারাবরণ করেন এবং দশ বছর তিন মাসের সাজাপ্রাপ্ত মামলায় তিনি কারাবাস করেছিলেন।

২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর বিএনপির পার্টি অফিস থেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর তার ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মত এবং হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে দলের সমস্ত কর্মসূচি পালনে তার ভূমিকা ছিল অসীম। এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তিনি রাজপথে সম্মুখ সারীতে থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে আন্দোলন করেছেন। আন্দোলন করা অবস্থায় কাকরাইলে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, যে কারণে জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন মহলে তিনি এখন আলোচিত ছাত্রনেতা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির বর্তমান রাজনীতিতে দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা এবং নির্যাতনের শিকার নেতাদের মূল্যায়ন বাড়ছে। বিশেষ করে ছাত্রদল থেকে উঠে আসা নেতাদের যুবদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আনার বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি চিন্তাভাবনা রয়েছে। আর সেই হিসাব-নিকাশেই সোহাগ ভূঁইয়ার নাম এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রমেও তাকে সরব দেখা গেছে। সম্প্রতি মহানগর পূর্বের আওতাধীন একাধিক ইউনিটের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ও পুনর্গঠনে তার ভূমিকার খবর প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, গ্রেপ্তার-নির্যাতনের প্রতিবাদে মিছিল এবং মাঠকেন্দ্রিক কর্মসূচিতেও নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে তাকে।

যুবদলের সম্ভাব্য কমিটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেন্দ্র এবার এমন নেতৃত্ব খুঁজছে যারা একইসঙ্গে মাঠে সক্রিয়, সাংগঠনিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নে দক্ষ। সেই বিবেচনায় সোহাগ ভূঁইয়াকে সাধারণ সম্পাদক পদের অন্যতম শক্ত দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে যুবদলের রাজনীতিতে একাধিক সাবেক ছাত্রনেতা ও পুরনো যুবদল নেতার নামও আলোচনায় রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদ জোটে, তা নির্ভর করবে বিএনপির হাইকমান্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। তারপরও রাজনৈতিক অঙ্গনের হিসাব-নিকাশে এবং তৃণমূলের আলোচনায় এখন অন্যতম আলোচিত নাম সোহাগ ভূঁইয়া।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোহাগ ভূঁইয়া বলেন, ‘দল চাইলে আমাকে যে দায়িত্ব দেবেন ইনশাল্লাহ সেটি আমি যথেষ্টভাবে পালন করার চেষ্টা করব। তবে সর্বক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্ত আমার কাছে সবচেয়ে বড়। তাছাড়া পদ পদবির বিষয়ে দলীয় হাই কমান্ড প্রধানমন্ত্রী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে তিনি এ বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নিবেন সেটাই চূড়ান্ত।