বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবি আদায় করতে হবে, যাতে কোনো ষড়যন্ত্রকারী স্যাবোটাজ করে আন্দোলনকে কলুষিত করতে না পারে।
শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) ব্রিটিশ সরকারের আমন্ত্রণে যুক্তরাজ্য সফরে থাকা অবস্থায় দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে তিন এ কথা বলেন।
জামায়াত আমির বলেন, শারীরিকভাবে দেশের বাইরে থাকলেও তার মন পড়ে আছে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে। প্রতিটি মুহূর্তে তিনি দেশের সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছেন এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখছেন বলেও জানান।
বিবৃতিতে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির শাহাদাতে গভীর শোক ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ের কথা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শহীদ হাদি মহান আল্লাহর মেহমান হয়ে গেছেন।’
তিনি হাদির রুহের মাগফিরাত কামনা করে বলেন, ‘আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন। শহীদ হাদী একটি আধিপত্যমুক্ত, স্বাধীন ও ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং শাহাদাত পর্যন্ত সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি সহিংসতার পথে নয়, বরং যুক্তি, আদর্শ ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে ইনসাফের লড়াইয়ে বিশ্বাসী ছিলেন।’
জামায়াত আমির দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর রক্ত কখনোই বিফলে যাবে না। তাঁর স্বপ্নের ‘ইনসাফের বাংলাদেশ’ গড়তে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।’
তিনি হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সকল অপরাধীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানান, আবেগ নয়—ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমেই ন্যায়বিচার আদায় করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত কয়েকটি উদ্বেগজনক ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এবং প্রবীণ সম্পাদক নুরুল কবিরের ওপর হামলা ও অপপ্রচারের ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।’ ফ্যাসিবাদের আমলে যেভাবে গণমাধ্যমের ওপর নগ্ন হামলা চালানো হতো সে সংস্কৃতিতে দেশ যেন আর ফিরে না যায় সেদিকেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে তিনি গণমাধ্যমগুলোর প্রতি দেশের এই সংকটময় সময়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান।
বিবৃতিতে তিনি হাইকমিশন কার্যালয় ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এসব কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এগুলো দেশ ও আন্দোলনের স্বার্থের পরিপন্থি।
ধর্ম অবমাননার প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, ধর্ম অবমাননা চরম অন্যায় ও গর্হিত অপরাধ। তবে এ ধরনের অভিযোগে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াও সমান অপরাধ।
ময়মনসিংহে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক হিন্দু যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তিনি তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, বিচার নিজ হাতে তুলে নেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। অপরাধের বিচার অবশ্যই আদালতের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের মূলধারার ইসলামপন্থি দল ও সংগঠনগুলো নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী এবং কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পক্ষে নয়। পরিকল্পিতভাবে আন্দোলনকে কলুষিত ও স্যাবোটাজ করার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ঘটনার আগে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নেওয়া এবং ঘটনার পর দীর্ঘ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা প্রশাসনের ভেতরে থাকা কিছু দোসরের জড়িত থাকার ইঙ্গিত দেয়। তিনি দেশবাসীকে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান, যেন কেউ স্যাবোটাজ করার সুযোগ না পায়।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং অবিলম্বে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক করে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার এখনই সময়।
বিবৃতির শেষাংশে জামায়াত আমির বলেন, ‘দেশকে অস্থিতিশীল করার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। বিভাজনের সুযোগ নিলেই আধিপত্যবাদ শক্তিশালী হয়। আজ যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ হই, তবে শহীদ ওসমান হাদীর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না।’
তিনি সকল বিভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
শেষে তিনি দোয়া করে বলেন, ‘শহীদ হাদীর রক্ত আমাদের ঐক্যবদ্ধ করুক। মহান আল্লাহ যেন বাংলাদেশকে হেফাজত করেন।’



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন