বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদের একটি বড় অংশ বিদায় নিলেও এর কালো ছায়া এখনো রয়ে গেছে। জাতীয় নির্বাচন শেষে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশ ঘুরে দাঁড়ালেও সংকট এখনো কাটেনি। সমাজে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও প্রতিহিংসার প্রবণতা বিদ্যমান।
তিনি আরও বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক এবং বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, যা দুঃখজনক। রাজনীতিবিদদের কথার সঙ্গে কাজের মিল না থাকায় মানুষের মধ্যে রাজনীতির প্রতি আস্থা কমে গেছে। একটি জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।
রোববার (২২ মার্চ) সকালে সার্কিট হাউসে সিলেটে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। মতবিনিময় সভায় সিলেটে কর্মরত প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক অংশ নেন। এ সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।
গণভোট ও সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে মত দিলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। এ অবস্থায় মানুষের মধ্যে আবারও অনাস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। জনগণের অর্থ ও স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। আমরা বিরোধী দল হিসেবে সংসদের ভেতরে ও বাইরে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করব। তবে জনগণের অধিকার রক্ষায় কোনো আপস করব না।
নতুন ও ইতিবাচক ধারার রাজনীতি গড়ে তুলতে গত নির্বাচন বর্জন করা হয়নি জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অতীতের ধারায় আমরা নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গেই তা প্রত্যাখ্যান করিনি। আমরা বলেছি, বুকে চাপ নিয়ে নির্বাচন মেনে নিয়েছি। তারপরও টিআইবি, সুজনের মতো সংগঠন নির্বাচন নিয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেছে। আমরা মনে করি, গত নির্বাচন কেমন হয়েছে তা বোঝার জন্য এসব প্রতিবেদন সহায়ক হবে।
পৃথিবীর অনেক দেশে সংবিধান পরিবর্তন হয় উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান পরিবর্তন ও সংশোধন জাতির দাবি। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার এই দাবি দ্রুত পূরণ করবে।
এ সময় তিনি আরও বলেন, গত নির্বাচনে ৬৫ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন, তারা সংস্কার চান। কিন্তু মানুষের সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। গণভোটের এক অংশ বাস্তবায়ন হলেও আরেক অংশ এখন পর্যন্ত উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই রাষ্ট্রপতি কার্যত ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনি সংসদে ভাষণ দেবেন তা আমরা চাইনি। রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের আপত্তি নেই, তবে ব্যক্তি সম্পর্কে আপত্তি আছে। এ বিষয় থেকে মুক্তি দিতে সরকারি দলের কাছে অনুরোধ জানান ডা. শফিকুর রহমান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ঢাকায় থেকে সড়কপথে সিলেটে আসার সময় বিভিন্ন স্থানে যখনই ভাঙা রাস্তার সম্মুখীন হয়েছি, তখনই বলেছি ‘ওয়েলকাম টু সিলেট’। কিন্তু বাস্তবে সড়কসহ নানা খাতে উন্নয়নের অভাব স্পষ্ট। তিনি বলেন, শুধু সড়ক নয়, সব খাতেই সিলেটের যে প্রাপ্য, তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা অতিরিক্ত কিছু চাই না, ন্যায্য অধিকারটাই চাই।
তিনি আরও বলেন, সিলেটের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বিরোধী দল হিসেবে তারা জনগণের পক্ষে দাবি তুলবেন, তবে বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রয়োজন। জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই জনগণের কাজ হওয়া উচিত, যাতে জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।
মতবিনিময় সভায় তিনি সিলেটের সাংবাদিক সমাজের ঐতিহ্য ও সামাজিক সহমর্মিতার প্রশংসা করেন এবং বলেন, সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও সিলেট জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান, সিলেট অঞ্চল টিম সদস্য হাফিজ আব্দুল হাই হারুন, মহানগর নায়েবে আমির হাফিজ মিফতাহুদ্দীন আহমদ ও ড. নূরুল ইসলাম বাবুল, মহানগর সেক্রেটারি মো. শাহজাহান আলী, জেলা সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন, মহানগর সহকারী সেক্রেটারি জাহেদুর রহমান চৌধুরী ও মাওলানা ইসলাম উদ্দিন, সিলেট মহানগর ছাত্রশিবির সেক্রেটারি এটিএম ফাহিম প্রমুখ।
এদিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে ডা. শফিকুর রহমান সদ্য প্রয়াত দক্ষিণ সুরমা থানা আমির মরহুম মাওলানা মুজিবুর রহমানের কবর জিয়ারত করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
-20260321112541.webp)


