সম্প্রতি অনুষ্ঠিতব্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরীক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ তুলে পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে প্রশ্নফাঁস বন্ধ ও নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ৫টি করণীয় তুলে ধরেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব মোহাম্মদ মিরাজ মিয়া।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রশ্নফাঁস চক্রের তৎপরতা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার কথা তুলে ধরেন। পাঠকদের জন্য তার বক্তব্যটি হুবহু প্রকাশ করা হয়েছে।
পোস্টে মোহাম্মদ মিরাজ মিয়া বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিতব্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের স্পষ্ট আলামত রয়েছে বলে শিক্ষার্থীরা দাবি করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রাথমিক শিক্ষা খাতে এমনিতেই মেধাবীরা আগ্রহী হন না। যারা চাকরিতে যোগ দেন, তারাও নানা অনিয়ম, স্বল্প সুযোগ-সুবিধা ও বৈষম্যের কারণে পরবর্তীতে অন্য ভালো চাকরিতে চলে যান।
তিনি আরও বলেন, প্রশ্নফাঁস চক্র ও ডিভাইস চক্রের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিরা শিক্ষক হয়ে প্রবেশ করছে, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি—প্রাথমিক শিক্ষাকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এনসিপি নেতা মনে করেন, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দলেরই কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি। রাষ্ট্রের প্রতিটি নিয়োগ মেধাভিত্তিক হওয়ার দাবিটিই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরেন—
প্রথমত, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত পুরো চক্র যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ প্রশ্নফাঁসের সাহস না পায়।
দ্বিতীয়ত, জেলা ভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতি বাতিল করে শুধুমাত্র ঢাকা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নিয়োগ পরীক্ষাগুলো আয়োজনের প্রস্তাব দেন তিনি, যা প্রশ্নফাঁস ও স্থানীয় প্রভাব কমাতে সহায়ক হবে।
তৃতীয়ত, প্রাথমিক শিক্ষা যেহেতু একটি বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর, তাই শুধু প্রিলিমিনারি ও সংক্ষিপ্ত ভাইভার পরিবর্তে লিখিত পরীক্ষাও অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার মতো একইসঙ্গে প্রিলি ও লিখিত পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। প্রিলিতে উত্তীর্ণদের লিখিত খাতা মূল্যায়ন করলে সময়ও কম লাগবে এবং স্বচ্ছতাও বাড়বে বলে মত দেন তিনি।
চতুর্থত, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পর গঠিতব্য তিনটি কর্ম কমিশন—জেনারেল, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাগুলো পিএসসি (শিক্ষা)-এর অধীনে নেওয়া উচিত। তিনটি পিএসসিকে পূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন দিয়ে কার্যকর করা গেলে ধীরে ধীরে সব নিয়োগ পরীক্ষা পিএসসির আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত হবে এবং রাষ্ট্রের ওপর তরুণদের আস্থা বাড়বে।
পঞ্চমত, তিনি জোর দিয়ে বলেন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও এসব সংস্কার বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব, যখন নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে ন্যূনতম আন্তরিকতা ও সিরিয়াসনেস থাকবে। রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বুঝতে হবে—এই নিয়োগ পরীক্ষাগুলো দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণের জীবনের স্বপ্নের সঙ্গে জড়িত এবং তাদের একমাত্র চাওয়া হলো একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে বারবার প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এ ধরনের প্রস্তাব ও সুপারিশ বাস্তবায়ন করা গেলে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আস্থা ও মান দুটোই ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।



