পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় সুদভিত্তিক লেনদেন যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে বারবার মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তখন ‘সুদমুক্ত’ বা ‘ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক’ ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০০৮ সালের বিশ্ব মন্দা কিংবা সাম্প্রতিক কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক অস্থিরতায় দেখা গেছে, প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনেক বেশি স্থিতিশীল।
১. সম্পদ-ভিত্তিক অর্থায়ন বনাম ঋণ-ভিত্তিক অর্থায়ন
প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থা মূলত ‘ঋণ-ভিত্তিক’। এখানে টাকা দিয়ে টাকা কেনা হয়, যা বাজারে কৃত্রিম মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা ‘সম্পদ-ভিত্তিক’।
প্রক্রিয়া: ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাংক গ্রাহককে সরাসরি নগদ টাকা সুদে ধার দেওয়ার বদলে পণ্য বা সম্পদ ক্রয় করে দেয়। ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহের সাথে সাথে পণ্যের জোগান নিশ্চিত হয়।
ফলাফল: এটি ফটকা কারবারি বা 'স্পেকুলেটিভ বাবল' তৈরি হতে বাধা দেয়, যা বিশ্ব মন্দার অন্যতম প্রধান কারণ।
২. ঝুঁকি অংশীদারিত্ব (Risk Sharing)
সুদভিত্তিক ব্যবস্থায় লাভ হোক বা লোকসান, গ্রাহককে নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদান করতেই হয়। মন্দার সময় যখন ব্যবসায় লোকসান হয়, তখন সুদের বোঝা ব্যবসার মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
সুদমুক্ত সমাধান: ইসলামি ব্যাংকিংয়ে ‘মুদারাবা’ বা ‘মুশারাকা’ পদ্ধতিতে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়েই লাভ-লোকসানের অংশীদার হয়। ব্যবসায় লোকসান হলে ব্যাংকও তার দায়ভার গ্রহণ করে। এই ব্যবস্থার কারণে উদ্যোক্তারা চরম মন্দার সময়ও দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা পান।
৩. মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা
সুদভিত্তিক ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়ে বা কমিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, যা অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়। সুদমুক্ত ব্যবস্থায় যেহেতু সুদের অস্তিত্ব নেই, তাই এখানে বিনিয়োগ সরাসরি উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়। যখন বিনিয়োগ সরাসরি কৃষি বা শিল্পে উৎপাদন বাড়ায়, তখন বাজারে পণ্যের দাম স্বাভাবিক থাকে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকে।
৪. সুদমুক্ত ব্যাংকিং বনাম প্রথাগত ব্যাংকিং: একটি তুলনামূলক চিত্র
প্রথাগত বনাম সুদমুক্ত ব্যাংকিং: মৌলিক পার্থক্য
ভিত্তি: প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থা ঋণ ও সুদের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, সুদমুক্ত ব্যাংকিং পরিচালিত হয় সরাসরি সম্পদ কেনাবেচা এবং লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে।
ঝুঁকি: সাধারণ ব্যাংকিংয়ে সমস্ত ঝুঁকি গ্রাহককে বইতে হয়, কিন্তু সুদমুক্ত ব্যবস্থায় ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়ই ব্যবসার ঝুঁকি ও দায়ভার সমানভাবে ভাগ করে নেয়।
বিনিয়োগ: প্রথাগত ব্যাংক যেকোনো লাভজনক খাতে অর্থায়ন করে। বিপরীতে, সুদমুক্ত ব্যাংক কেবল শরিয়াহসম্মত ও জনকল্যাণমূলক কাজে বিনিয়োগ নিশ্চিত করে।
মন্দা মোকাবিলা: মন্দার সময় সুদভিত্তিক ঋণের চাপে ব্যবসায়ীরা দ্রুত দেউলিয়া হয়ে পড়ে। তবে সুদমুক্ত ব্যবস্থায় লোকসান ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ থাকায় সংকটকালেও ব্যবসায় টিকে থাকা সহজ হয়।
৫. নৈতিক বিনিয়োগ ও সামাজিক নিরাপত্তা
সুদমুক্ত ব্যাংকিং কেবল মুনাফা নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা বা 'মাকাসিদ-আল-শরিয়াহ'র ওপর গুরুত্ব দেয়। মাদক, জুয়া বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো খাতে এই ব্যাংক বিনিয়োগ করতে পারে না। মন্দার সময় যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তখন ইসলামি ব্যাংকিংয়ের 'জাকাত' ও 'কর্জ-এ-হাসানা' (সুদমুক্ত ঋণ) তহবিলগুলো সামাজিক নিরাপত্তাবলয় হিসেবে কাজ করে।
বর্তমান বিশ্বের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক কাঠামোয় সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক সমাধান হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে। আইএমএফ (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরণের আর্থিক ধাক্কা সইতে বেশি সক্ষম। তবে এই ব্যবস্থাকে বিশ্বব্যাপী কার্যকর করতে হলে শক্তিশালী নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন