রমজান মাস মুমিন মুসলমানের জীবনে এক মহিমান্বিত সুযোগ। এটি কেবল পানাহার বর্জনের নাম নয়, বরং আল্লাহর সান্নিধ্য বা ‘কুরবত’ লাভের এক অনন্য রূহানি মাধ্যম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা রোজার মূল উদ্দেশ্য হিসেবে ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি অর্জনের কথা বলেছেন। কিন্তু আজকের আধুনিক সমাজে আমাদের রোজা রাখার ধরণ এবং জীবনযাত্রা দেখলে মনে প্রশ্ন জাগে- আমরা কী আসলেই রোজা রাখছি, নাকি কেবল যান্ত্রিকভাবে নামমাত্র উপবাস পালন করছি?
রোজার প্রকৃত রহস্য নিহিত রয়েছে এর আধ্যাত্মিক গভীরতায়। যখন একজন মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বৈধ খাবার ও আনন্দ ত্যাগ করে, তখন তার নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই আত্মিক নিয়ন্ত্রণই তাকে স্রষ্টার সাথে এক গভীর সংযোগে আবদ্ধ করে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘রোজা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।’ এমনকি জান্নাতে ‘রাইয়ান’ নামক একটি বিশেষ দরজা শুধু রোজাদারদের জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে এই বিরল সম্মান কেবল পেট ক্ষুধার্ত রাখার জন্য নয়, বরং চোখ, কান, জবান এবং অন্তরকে যাবতীয় পাপাচার থেকে মুক্ত রাখার বিনিময়ে। আল্লাহর সান্নিধ্য অনুভব করাই হলো রোজার আসল সার্থকতা।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমান সময়ে আমরা রোজাকে অনেকটা ‘খাদ্য উৎসবে’ পরিণত করেছি। নবীজি (সা.) ও সাহাবীগণের আমল ছিল এর চেয়ে একদম ভিন্ন এবং ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল। তাঁদের খাদ্যাভ্যাস ছিল অত্যন্ত সাদাসিধা; সামান্য খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার এবং যবের রুটি বা দুধ দিয়ে সেহরি করেই তাঁরা ইবাদতে মগ্ন হতেন। অথচ আমাদের সমাজে আজ ধনী-দরিদ্রের খাবারের মাঝে এক আকাশ-পাতাল বৈষম্য দৃশ্যমান। ধনীরা ইফতার ও সেহরিতে হরেক পদের মুখরোচক ভাজাপোড়া, জুস, হালিম আর ফিরনির রাজকীয় আয়োজন করে, যা অনেক সময় অপচয়ের পর্যায়ে চলে যায়। অন্যদিকে, সমাজের একটি বড় অংশ সামান্য ছোলা-মুড়ি বা পানি দিয়ে ইফতার করে অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছে। ইসলামে অপচয়কারীকে ‘শয়তানের ভাই’ বলা হয়েছে; তাই সারাদিন ক্ষুধার্ত থেকে সন্ধ্যায় রাজকীয় ভোজের আয়োজন করা রোজার ‘তাকওয়া’ গুণের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এই বৈপরীত্যের ভিড়ে একটি গভীর জীবনঘনিষ্ঠ দৃশ্যপট কল্পনা করা যাক। এক পড়ন্ত বিকেলে ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে এক ব্যক্তির আঙিনায় ভিড় জমেছে। সবাই অপেক্ষায় পবিত্র মুহূর্তটির। এমন সময় জনৈক আগন্তুক এক কাঁদি কলা নিয়ে হাজির হলেন। উপস্থিত সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে সেই আঙিনার মধ্যমণি, যাকে সবাই পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখে- তিনি হুট করে একটি কলা ছিঁড়ে মুখে দিলেন এবং এক গ্লাস পূর্ণ পানি পান করতে চাইলেন। মুহূর্তেই চারদিকের গুঞ্জন আর আড়চোখে তাকানো শুরু হলো। ইফতারের মাত্র কয়েক মিনিট বাকি থাকতে এই ‘অধৈর্য’ আচরণ দেখে অনেকের মনেই সংশয় জাগল- ইনি কেমন মানুষ? অথচ তাদের মনের না বলা কথাগুলো যেন লোকটির কানে পৌঁছে গেল। তিনি করুণ মাখা হাসিতে বলে উঠলেন, ‘তোমরা যারা সেহরি আর ইফতারে পেট ভরে খেয়ে আমার সামান্য একটি কলা খাওয়া নিয়ে বিচারে বসেছো, তারা কি জানো- গত সাত দিন এই শরীরে এক দানা অন্নও পড়েনি? জীবন বাঁচাতে সামান্য গ্রহণ করা আমার জন্য তখন তকদীরের লিখন ছিল।’ তিনি থামলেন না, বরং শান্ত কণ্ঠে যোগ করলেন, ‘তোমরা যারা সেহরি আর ইফতারে পেট ভরে খাও, তোমাদের রোজা রাখা আর আমার সাত দিনের অভুক্ত শরীরে এইটুকু গ্রহণের মাঝে যে তফাৎ, তা কি সময় দিয়ে মাপা যায়? কারো পরিস্থিতি না জেনে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো আমাদের আত্মার ক্ষুদ্রতা ছাড়া আর কিছুই নয়।’
সবচেয়ে মর্মান্তিক সত্য হলো, যখন বিত্তবান রোজাদাররা হরেক পদের খাবারে দস্তরখান সাজান, ঠিক তখনই হয়তো তাদের দেয়াল ঘেঁষে থাকা প্রতিবেশী এক মুঠো ছোলা-মুড়ি কিংবা সামান্য একটু পানির অপেক্ষায় প্রহর গোনে। এমনও অনেক পরিবার আছে যারা ইফতার বা সেহরিতে কোনো খাবার না জুটলে শুধু পানি খেয়েই দিন পার করেন, অথচ এই ‘মুসলমান’ দাবিদাররা প্রতিবেশীকে ক্ষুধার্ত রেখে আয়েশ করেন। এদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সতর্কবাণী অত্যন্ত কঠোর। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, সেই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট ভরে খায় অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে। প্রতিবেশীকে অভুক্ত রাখা শুধু সামাজিক অপরাধ নয়, বরং এটি ঈমান না থাকার লক্ষণ। হাশরের ময়দানে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে প্রশ্ন করবেন যে তিনি ক্ষুধার্ত ছিলেন কিন্তু বান্দা তাকে খাবার দেয়নি; তখন বিস্মিত বান্দার প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ বলবেন যে তাঁর অমুক বান্দা ক্ষুধার্ত ছিল, তাকে খাওয়ালে আজ তাঁর কাছেই তার প্রতিদান পাওয়া যেত।
এর চেয়েও বড় আশঙ্কার বিষয় হলো আমাদের উপার্জনের উৎস। ইবাদত কবুল হওয়ার অপরিহার্য শর্ত হলো ‘হালাল রিযিক’। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে, হারাম খাদ্যে লালিত-পালিত দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আমরা যদি সারাদিন উপবাস থেকে ইফতারের টেবিলে এমন খাবার রাখি যা সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি বা অন্যের হক নষ্ট করা টাকায় অর্জিত- তবে সেই রোজা আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইবাদত কবুলের জন্য ‘তৈয়্যিব’ বা পবিত্র আহার বাধ্যতামূলক। হারাম উপার্জনে কেনা উন্নত খাবার দিয়ে ইফতার করলে শরীরের ক্ষুধা মিটতে পারে, কিন্তু আত্মার ক্ষুধা মেটে না। এমন রোজা কেবল একটি শারীরিক কসরত বা অর্থহীন উপবাসে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
আরও এক বিড়ম্বনার চিত্র দেখা যায় আমাদের সামাজিক আচরণে। অনেকে রোজা রাখেন ঠিকই, কিন্তু সেই রোজার দোহাই দিয়ে পরিবার-পরিজন বা সহকর্মীদের ওপর খিটখিটে মেজাজ দেখান, তুচ্ছ কারণে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রোজার ক্লান্তি দেখিয়ে অধীনস্থ কর্মচারীর ওপর চড়াও হন, কিংবা রাস্তায় সামান্য কারণে মারামারিতে লিপ্ত হন। অথচ হাদিসে বলা হয়েছে, কেউ গালি দিলে রোজাদার যেন বলে- ‘আমি রোজাদার।’ অন্যায়ভাবে মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে যে রোজা রাখা হয়, তা কেবলই উপবাস ছাড়া আর কিছু নয়।
একইভাবে সমাজে অনেক ঋণখেলাপী মানুষকে দেখা যায়, যারা আলিশান ইফতার ও সেহরি করছেন, লম্বা তসবিহ হাতে তারাবি পড়ছেন, অথচ তাদের ঋণের কারণে অন্য মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। মানুষের হক (হক্কুল ইবাদ) নষ্ট করে এই আড়ম্বরপূর্ণ ইবাদত কি সত্যিই আল্লাহর কাছে পৌঁছাবে? রাসুল (সা.)-এর বাণী অনুযায়ী, মানুষের অধিকার নষ্টকারীর ইবাদত বাতাসের মতো ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।
তাই রোজাকে সার্থক করতে এবং আল্লাহর সাথে প্রকৃত রূহানি সংযোগ স্থাপন করতে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা জরুরি। লোকদেখানো আভিজাত্য ত্যাগ করে নবীজির সুন্নাহ অনুযায়ী পরিমিত ও হালাল খাবারের অভ্যাস করতে হবে। নিজের ইফতারের টেবিল সাজানোর আগে পাশের ক্ষুধার্ত প্রতিবেশী বা অভাবী মানুষের খবর নেওয়া মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। কেবল পেটের রোজা নয়, বরং মিথ্যা, গীবত ও পাপাচার থেকে জবান ও অন্তরকে হেফাজত করাই হোক আমাদের লক্ষ্য। তবেই রোজা আমাদের চরিত্রে পরিবর্তন আনবে এবং আমরা সেই কাক্সিক্ষত 'তাকওয়া' অর্জন করতে সক্ষম হব। আল্লাহ আমাদের লোকদেখানো ইবাদত ছেড়ে প্রকৃত রোজাদার হওয়ার তৌফিক দান করুন।
লেখক : গবেষক

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন