বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে প্রতিবারই দেখা দেয় এক অন্যরকম উন্মাদনা। এই উন্মাদনার ব্যাপারটা পুরোনো। ফুটবল পাগল মানুষদের মধ্যে যে উত্তেজনা থাকে তার কেন্দ্রে থাকে লাতিন আমেরিকার দল আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল।
বাংলাদেশে অন্য আরও বেশকিছু দলের সমর্থক থাকলেও তাদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। মূলত ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকে ঘিরে পুরো দেশ দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শুধু নিজ দলকে সমর্থন না, প্রতিপক্ষ দলের সাপোর্টারদের কীভাবে কুপোকাত করা যায় সেটা নিয়েই চলে এক ধরনের প্রতিযোগিতা। অনেক সময় দুদলের সমর্থকদের মধ্যে চলে তুমুল তর্কাতর্কি যা হাতাহাতি, মারামারি পর্যন্ত গড়ায়। এর আগের বিশ্বকাপ খেলাগুলোতেও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনেক সাপোর্টার মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকারও হয়েছেন। যা কখনোই কারো কাম্য নয়। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল উত্তেজনা যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়।
বিশ্বকাপ শুরুর আর মাত্র দিনকয়েক বাকি। দেরিতে হলেও চার বছর পর বিশ্বকাপের খেলাগুলো উপভোগ করার জন্য দেশের মানুষ এরই মধ্যে প্রস্তুত। অনেকেই নিজ দলের জার্সি ও পতাকা সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে অনেক ধরনের আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ। অনেক ধরনের হিসাব কষছেন তারা। আর এসবের কেন্দ্রে রয়েছে সেই ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা।
মাসখানেক আগে থেকেই মিডিয়াগুলোয় কাউন্টডাউন শুরু হয়। নানা ধরনের প্রতিবেদন ছাপতে দেখা যায়। তবে এবার এতে কিছুটা হলেও ঘাটতি দেখা গেছে। বিশ্বকাপের প্রচারে আগের মতো কলেবর না থাকলেও মিডিয়াগুলো বিশেষ ম্যাগাজিন প্রকাশ করবে এবং করেছে, যেখানে সব দলকে নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কোন দলের সম্ভাবনা কতটুকু তা নিয়েও চলছে বিশ্লেষণ। রাজনৈতিক খবরের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমেও বিশ্বকাপের খবর গুরুত্বের সাথে ছাপা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ফুটবলের দর্শক মূলত দুই ধরনের। এক ধরনের দর্শক হলো শহরকেন্দ্রিক, যারা প্রায় বছরজুড়ে ইউরোপের লীগ দেখে। দুবছর অন্তর কোপাও দেখে তারা। তারা অনেক খোঁজ-খবর রাখেন ফুটবলের। অনেক খেলোয়াড়কেও তারা চেনেন।
আরেক ধরনের দর্শক থাকেন যারা বিশ্বকাপকেন্দ্রিক। তাদের সংখ্যা মূলত বেশি গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সারা বছর ফুটবল খেলা না দেখলেও বিশ্বকাপকে ঘিরে চার বছর পর গ্রামের মানুষের মাঝে এক ধরনের উত্তেজনাকর আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।
তাদের মধ্যে পতাকা নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়, কে কত বড় পতাকা বানাতে পারে। নিজ নিজ বাড়ির ছাদে পতাকা টাঙিয়ে জানান দেওয়া হয় কে, কোন দলের সমর্থক। এইবারের বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের রাস্তা, বাড়ি ও মাঠ-ঘাট এখন বিভিন্ন দেশের পতাকায় ছেয়ে গেছে। এ যেন এক অন্য ধরনের উন্মাদনা। পতাকা টানাতে গিয়ে কোনো কোনো জায়গায় দুর্ঘটনাও ঘটে থাকে।
এবারও বিভিন্ন দলের সাপোর্টাররা ফেসবুকে নতুন নতুন গ্রুপ খুলে তাদের দলের পক্ষে প্রচারে নেমে পড়েছেন। আবার কনটেন্ট ক্রিয়েটররা অনেকেই বিনোদনমূলক ভিডিও তৈরি করেছেন। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার দুই সাপোর্টারের পক্ষে-বিপক্ষের তুমুল তর্কাতর্কির মাঝে আরেক বন্ধু খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়ে বলছেন- দেখ বন্ধু, আর্জেন্টিনার মানুষ তোকেও চেনে না, ব্রাজিলের মানুষও তোদের চেনে না। মাঝখান দিয়ে দুই দেশের দুই সাপোর্টার হয়ে একে অন্যের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করে হাতাহাতি মারামারি করছিস। তোরা খুনুখুনি করে আহত-নিহত হলে ওই দেশের কেউ তোদের দেখতেও আসবে না। কেউ মারা গেলে কোনো দেশের কেউ তোদের কাউকে মাটিও দিতে আসবে না। যারা ভালো খেলবে তাদের যে-কেউ ভালো বলবে। যারা খারাপ খেলবে তাদের সবাই খারাপ বলবে- এটাই স্বভাবিক। পরে দুই বন্ধু ভুল বুঝতে পেরে একে অন্যকে বুকে টেনে নেয়। এ ধরনের ভিডিওতে অবশ্য অনেক ভিউ হতে দেখা যায়।
বাংলাদেশে ফুটবলের সমর্থকের বেলায় আর্জেন্টিনার মেসি ও ব্রাজিলের নেইমারই প্রাধান্য পায় বেশি। মজার বিষয় হলো, এই দুই খেলোয়াড়ের বাইরে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ অন্য খেলোয়াড়দের তেমন চেনে না। যারা প্রায় বছরজুড়ে ইউরোপের লীগ দেখে, দুবছর অন্তর কোপাও দেখেন অনেকে। তারা অনেক খোঁজখবর রাখেন ফুটবলের। অনেক খেলোয়াড়কেও তাই তারা চেনেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ক্রিকেট সুনাম অর্জন করায় ক্রিকেটপ্রেমীদের সংখ্যা বেড়েছে। এই সংখ্যার মাঝেও বিশ্বকাপ ফুটবলের জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র কমেনি।
উল্লেখ্য, বিশ্বকাপের মূল উত্তেজনা শুরু হবে ১১ জুন। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা ছাড়াও তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের সমর্থকরা মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখবেন। খেলার ফল যা-ই হোক তারা মেতে উঠবেন বিচার-বিশ্লেষণ, আলোচনা-সমালোচনায়। আর যত দিন গড়াবে, এই মাতামাতি যেন বাড়তেই থাকবে।
বিশ্ব ফুটবলে অসংখ্য কিংবদন্তি এবং তারকা খেলোয়াড় রয়েছেন, যারা অসাধারণ নৈপুণ্য, রেকর্ড এবং সাফল্যের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে সর্বকালের সেরা এবং বর্তমান সময়ের নামকরা খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বকালের সেরা কিংবদন্তি পেলে (ব্রাজিল) যিনি ফুটবল সম্রাট হিসেবে পরিচিত। তিনি একমাত্র ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ জিতেছেন।
দিয়েগো ম্যারাডোনা (আর্জেন্টিনা) ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী এবং ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ড্রিবলার। জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স) তার অসাধারণ ফুটবল শৈলী এবং মাঠের নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি বিখ্যাত। রোনালদো নাজারিও (ব্রাজিল) ‘এল ফেনোমেনো’ নামে পরিচিত। যিনি তার গতি এবং গোল করার দক্ষতার জন্য বিখ্যাত।
বর্তমান প্রজন্মের সেরা তারকা লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) রেকর্ড সংখ্যক ৮ বার ব্যালন ডি’অর বিজয়ী এবং বিশ্বকাপজয়ী। আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাস ও পরিসংখ্যান সংস্থা (IFFHS) তাকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে নির্বাচিত করেছে।
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা গোলমেশিন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল) এবং বর্তমান সময়ের অন্যতম দ্রুতগতির এবং বিধ্বংসী ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স)। অন্যান্য বিশ্বসেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে অসাধারণ ড্রিবলিং এবং স্কিলের জন্য পরিচিত নেইমার জুনিয়র (ব্রাজিল)। বর্তমান যুগের অন্যতম সেরা ও ভয়ংকর স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ডও (নরওয়ে) রয়েছেন।
এ ছাড়াও নব্বইয়ের দশকের আর্জেন্টাইন ফুটবলে দিয়েগো ম্যারাডোনা, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, ক্লদিও ক্যানিজিয়া, দিয়েগো সিমেওনে, রবার্তো আয়ালা, এরনান ক্রেসপো, ফার্নান্দো রেদোন্দো, আরিয়েল ওর্তেগা এবং হাভিয়ের জানেত্তির মতো বিশ্ব কাঁপানো তারকারা খেলেছেন। তাদের ক্ষিপ্র গতি, দুর্দান্ত গোল করার ক্ষমতা এবং নান্দনিক প্লে-মেকিংয়ের জন্য তারা বিশ্বজুড়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

