রোজারিওর উত্তর প্রান্তের সেই অতি সাধারণ ‘পেরেদ্রিয়েল স্ট্রিট’। যেখানে একসময় পাথরের টুকরো দিয়ে গোলপোস্ট বানানো হতো আর সূর্যের আলো নিভে গেলেই শেষ হতো ফুটবল খেলা। দীর্ঘ ১৭ বছর পর সেই ধুলোমাখা রাস্তায় যখন 'ঘরের ছেলে' ফিরলেন, তখন পুরো শহর উৎসবে মাতোয়ারা।
কাঁধে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে যে কিশোর একদিন ঘর ছেড়েছিলেন, আজ তিনি ফিরেছেন বিশ্বজয়ী মহাতারকা হয়ে। ফুটবল ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি বড় ট্রফি এখন তার শোকেসে।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম 'এএস'-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব, সংগ্রাম এবং সাফল্যের না বলা গল্প শুনিয়েছেন আনহেল দি মারিয়া, যাকে ভালোবেসে সবাই ডাকেন 'এল ফিদেও'।
দি মারিয়া জানান, তার ক্যারিয়ার তার নিজের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমার স্বপ্ন ছিল কেবল রোজারিও সেন্ট্রালের মূল দলে খেলা। এরপর যা ঘটেছে, তা ছিল স্রেফ ত্যাগ আর সুযোগ লুফে নেওয়ার গল্প।
প্রতিটি ট্রেন যখন আমার সামনে দিয়ে গেছে, আমি তাতে চড়েছি, আর সেই ট্রেন আমাকে বিশ্বের দুর্দান্ত সব জায়গায় নিয়ে গেছে।
৬টি ক্লাব, ১৪৫টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং রেকর্ড ৩৭টি ট্রফি—সব অর্জনের পরও দি মারিয়ার কণ্ঠে সেই চিরচেনা বিনয়।
দি মারিয়ার উঠে আসার গল্পটা রূপকথার মতো হলেও তাতে ছিল কঠোর বাস্তবতার ছাপ। তার বাবা কয়লা টানার কাজ করতেন। ১৬ বছর বয়সে বাবা তাকে এক চরম সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন।
সেই স্মৃতি রোমন্থন করে দি মারিয়া বলেন, পরিবার চালানোর জন্য বাবার আমাকে দরকার ছিল। তিনি আমাকে শেষ একটা সুযোগ দিয়েছিলেন কারণ মা তার কাছে অনুরোধ করেছিলেন।
মা বলেছিলেন, আমাকে যেন ফুটবলার হওয়ার জন্য আর একটা বছর দেওয়া হয়। সেই জানুয়ারিতে প্রি-সিজন শুরু করলাম, আর বছরের শেষেই আমার অভিষেক হলো। সেখান থেকেই আমার ক্যারিয়ারের শুরু।
দি মারিয়ার হাতে খোদাই করা আছে তার ছোটবেলার রাস্তার নাম—পেরেদ্রিয়েল। তিনি মনে করেন, এই রাস্তার ধুলোবালিই তাকে বিশ্বের অন্য ফুটবলারদের থেকে আলাদা করেছে। খালি পায়ে খেলা এবং পাথরের গোলপোস্টে বল মারার সেই দিনগুলোই তাকে শিখিয়েছে প্রতিকূলতায় হার না মানতে।
৩৭টি ট্রফির মধ্যে কোপা আমেরিকা ২০২১ জয়কে দি মারিয়া সবচেয়ে আবেগঘন বলে উল্লেখ করেন। দীর্ঘ ২৮ বছরের খরা কাটিয়ে ব্রাজিলের বিপক্ষে মারাকানায় তার সেই জয়সূচক গোলটি ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বোঝা নামানোর মুহূর্ত।
তিনি বলেন, জাতীয় দলের হয়ে একের পর এক ফাইনালে হারের যে মানসিক চাপ ছিল, ওই গোলটি তা চিরতরে ঘুচিয়ে দিয়েছে।
আর্জেন্টাইন ফুটবলের মহাগুরু সিজার লুইস মেনোত্তি একবার দি মারিয়াকে ম্যারাডোনা এবং মেসির কাতারেই স্থান দিয়েছিলেন। আজ যখন তিনি রোজারিও সেন্ট্রালের হয়ে গোল করে সমর্থকদের আনন্দ দিচ্ছেন, তখন নিজেকে স্রেফ একজন খেলোয়াড় নন, বরং সাধারণ মানুষের 'হিরো' হিসেবে অনুভব করছেন।
সাক্ষাৎকারের শেষে দি মারিয়া বর্তমান প্রজন্মের জন্য একটি বার্তাই দিয়েছেন—ত্যাগ এবং লড়াই। তার মতে, ফুটবল শুধু পায়ের খেলা নয়, এটি সেই মূল্যবোধের প্রতিফলন যা তিনি তার বাবার কয়লা টানার পরিশ্রম থেকে শিখেছিলেন।




