ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

কেন আজও ৮৬ বিশ্বকাপ মানেই ডিয়েগো ম্যারাডোনা?

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৬, ১২:৩১ পিএম
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ। ছবি : সংগৃহীত

ফুটবল ইতিহাসে গত ৬০ বছরে বহু কিংবদন্তির জন্ম হয়েছে, কিন্তু ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনা যা করেছিলেন, তা আজও অলৌকিক বলে মনে হয়। সেটি কেবল একটি টুর্নামেন্ট ছিল না, সেটি ছিল একজন মানুষের একক আধিপত্যের এক অমর মহাকাব্য। ডিয়েগো যেন মেক্সিকোর তপ্ত রোদে ফুটবলার হিসেবে নয়, এক ‘দৈব শক্তি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

অথচ বিশ্বকাপের ঠিক আগে চিত্রটা এমন ছিল না। কার্লোস বিলার্দোর আর্জেন্টিনা তখন সমালোচনা আর সন্দেহের জালে ঘেরা। ফ্রান্স ও নরওয়ের কাছে হার আর দলের ভেতরের অস্থিরতা নিয়ে যখন তারা মেক্সিকোতে পৌঁছাল, কেউ ভাবেনি এই দলই বিশ্ব জয় করবে। 

কিন্তু ইসরায়েলের বিপক্ষে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে ম্যারাডোনার জোড়া গোল যেন ছিল এক বিশেষ সংকেত—বিশেষ কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

টুর্নামেন্ট শুরু হতেই বিশ্ব দেখল এক অপ্রতিরোধ্য ম্যারাডোনাকে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে তাকে আটকানোর কোনো উপায় না পেয়ে রক্ষণের খেলোয়াড়রা তাকে ১২ বার ফাউল করল। কিন্তু লাভ হলো না, আর্জেন্টিনার ৩-১ গোলের জয়ে তিনটি অ্যাসিস্টই ছিল ডিয়েগোর। 

এরপর ইতালির জমাট রক্ষণ ভেঙে অবিশ্বাস্য এক কোণ থেকে গোল করে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, তিনি তখন এক ভিন্ন গ্রহের ফুটবল খেলছেন।

নক-আউট পর্বে উরুগুয়ের বিপক্ষে সেই ‘রিও দে লা প্লাতা’ ক্লাসিক ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক যুদ্ধ। কাদা-জল আর রুক্ষ ফাউলের মধ্যেও ম্যারাডোনা ছিলেন অবিচল। তার একটি ফ্রি-কিক পোস্টে লেগে ফিরে না আসলে সেটি হতে পারত ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল। তবে ভাগ্য বোধহয় ডিয়েগোর জন্য এর চেয়েও বড় কিছু জমা রেখেছিল আজতেকা স্টেডিয়ামে।

২২ জুন ১৯৮৬, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচটি ছিল ফুটবলের চেয়েও বেশি কিছু। ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত তখনো সতেজ। সেই ম্যাচেই ম্যারাডোনা জন্ম দিলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুই মুহূর্তের। 

প্রথমে সেই ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল। চারপাশ থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও ডিয়েগো ছিলেন নির্বিকার। ঠিক তার চার মিনিট পর তিনি করলেন ‘শতাব্দীর সেরা গোল’। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে পাঁচজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে যেভাবে তিনি বল জালে জড়ালেন, তা দেখে গোটা বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। 

সেদিন ধারাভাষ্যকার ভিক্টর হুগো মোরালেস তাকে দিয়েছিলেন মহাজাগতিক ঘুড়ির উপাধি।

সেমিফাইনালে বেলজিয়ামকে একাই গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—বিশ্বকাপ ফাইনাল। পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে যখন ম্যাচ ২-২ সমতায়, ঠিক তখনই ম্যারাডোনার সেই জাদুকরী স্পর্শ। তিন জন ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে বুরুচাগার উদ্দেশ্যে বাড়ানো সেই নিখুঁত পাসটিই আর্জেন্টিনাকে এনে দিল পরম আরাধ্য সোনালী ট্রফি।

সাত ম্যাচে পাঁচ গোল আর পাঁচ অ্যাসিস্ট—এই পরিসংখ্যানও আসলে সেই টুর্নামেন্টে ম্যারাডোনার প্রভাব বোঝাতে যথেষ্ট নয়। আর্জেন্টিনার মোট গোলের ৭১ শতাংশেই ছিল তার সরাসরি অবদান। মেক্সিকো ৮৬ কেবল একটি বিশ্বকাপ ছিল না; এটি ছিল ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার ফুটবল ঈশ্বর হয়ে ওঠার গল্প।