ইরানে রোববার (১৮ জানুয়ারি) স্বল্প সময়ের জন্য সীমিত আকারে ইন্টারনেট সেবা চালু হলেও তা পুনরায় বন্ধ হয়ে যায় বলে জানিয়েছে একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বিক্ষোভ দমনের আড়ালে হাজারো মানুষ হত্যার ঘটনা গোপন করতেই ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছিল।
গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর ইরানে মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কয়েক দিনের মধ্যে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। ৭ ও ৮ জানুয়ারি বিক্ষোভে প্রাণহানি বাড়লে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় খামেনি প্রশাসন।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা নেটব্লকস রোববার রাতে জানায়, ‘ইরানে নির্দিষ্ট কিছু গুগল ও মেসেজিং সেবায় অতি সীমিত ও কঠোরভাবে ফিল্টার করা পুনরুদ্ধারের পর আবারও ট্রাফিকের মাত্রা কমে গেছে।’
ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, শুরুতে বিক্ষোভগুলো শান্তিপূর্ণ ছিল, পরে তা ‘দাঙ্গায়’ রূপ নেয় এবং এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো শত্রু রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব রয়েছে।
জুন মাসে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেওয়ার পর ট্রাম্প একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন—বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
ওয়াশিংটন আপাতত কিছুটা পিছু হটলেও শনিবার ‘পলিটিকো’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে আক্রমণ করে বলেন, ‘ইরানে নতুন নেতৃত্ব খোঁজার সময় এসেছে।’
ট্রাম্প বলেন, ‘লোকটি একজন অসুস্থ মানুষ। তার উচিত দেশ সঠিকভাবে চালানো এবং মানুষ হত্যা বন্ধ করা।’
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমাদের দেশের মহান নেতার ওপর হামলা মানে ইরানি জাতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ।’
ওয়াশিংটন ও তেহরানের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, রাস্তায় এখন শান্তি ফিরেছে। এক সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর রোববার স্কুলগুলো আবার খুলে দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার বৈঠকে পেজেশকিয়ান জানান, তিনি ‘সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবকে যত দ্রুত সম্ভব ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সুপারিশ করেছেন।’
কিছু ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, হোয়াটসঅ্যাপে প্রবেশ করা যাচ্ছিল। মঙ্গলবার থেকে আন্তর্জাতিক কল চালু হয় এবং শনিবার এসএমএস সেবা ফের চালু করা হয়।
রোববার ফার্স নিউজ এজেন্সি জানায়, সরকারের ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর ইরানসেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বার্লিন, লন্ডন, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে সংহতি বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নানা তথ্য বাইরে পৌঁছেছে এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভয়াবহ নির্যাতনের খবর পেয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তারা সাম্প্রতিক দিনে যাচাই করা বহু ভিডিও ও বিবরণে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ‘বিক্ষোভকারীদের গণহত্যার’ প্রমাণ পেয়েছে।
নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) জানিয়েছে, তারা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত ৩ হাজার ৪২৮ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। এসব তথ্য তারা স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থা, প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্বাধীন সূত্র থেকে যাচাই করেছে।
তবে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। সংবাদমাধ্যমগুলো স্বাধীনভাবে এই সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি এবং ইরানি কর্তৃপক্ষও নির্দিষ্ট কোনো মৃত্যুর সংখ্যা জানায়নি।
অন্যান্য হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে, এমনকি ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। তবে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে স্বাধীন যাচাই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলে আইএইচআর জানিয়েছে।
বিদেশভিত্তিক বিরোধী চ্যানেল ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’ দাবি করেছে, জ্যেষ্ঠ সরকারি ও নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে তারা জানতে পেরেছে, বিক্ষোভে অন্তত ১২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
ইরানের বিচার বিভাগ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন