বিপ্লব, প্রতিবিপ্লব কিংবা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন- এসব ঘটনা সাধারণত কোনো পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করে না। ইতিহাস দেখায়, বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুহূর্তে প্রায়ই বিদেশে অবস্থানরত নির্বাসিত নেতারা নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র দখলের আশায় প্রস্তুত থাকেন। তবে ইতিহাস এটিও বলছে, নির্বাসিতদের এমন প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি অনেকটা গ্যাস স্টেশনের সুশি ট্রেতে হঠাৎ বাকলাভা খুঁজে পাওয়ার মতোই অপ্রত্যাশিত।
ইরানকে ঘিরে বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও সেই চিত্রই আবার সামনে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ইরানের সাবেক শাহের পুত্র রেজা পাহলভি আবারও ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলে তিনি দেশ পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।
ওয়াশিংটনের পুরোনো ধারা
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহলে বিদেশে থাকা বিরোধী রাজনীতিকদের দিয়ে ‘পরিবর্তনের নেতৃত্ব’ গঠনের চেষ্টা নতুন কিছু নয়।
সাদআম হুসাইনের পতনের পর ওয়াশিংটন-সমর্থিত ইরাকি নির্বাসিত রাজনীতিকদের সামনে আনা হয়েছিল। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি-ভিত্তিক কাস্ত্রোবিরোধী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে কিউবার ক্ষমতায় ফেরার আশায় সক্রিয় থেকেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মডেলে একটি সাধারণ সূত্র থাকে- সম্ভাব্য নেতা যত বেশি বিদেশে থাকেন, ওয়াশিংটনের কাছে তাকে তত বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়।
বর্তমান সংঘাত ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুন অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে ক্ষমতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প মন্তব্য করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রশ্নে আগ্রহী থাকতে পারে।
তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জটিল সমাজগুলোর একটি- ইরানকে নেতৃত্ব দেবেন, সেই প্রশ্নকে বাইরের শক্তির ‘কাস্টিং কল’-এর মতো দেখানো বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরে আলোচনায় উঠে আসছে কয়েকজন প্রভাবশালী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাম। এর মধ্যে রয়েছেন সর্বোচ্চ নেতার পুত্র মোজতবা খামেনি, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজে'ই, ধর্মীয় নেতা আলীরেজা আরাফি, রক্ষণশীল ধর্মতত্ত্ববিদ মোহাম্মদ মেহেদী মীরবাগেরি এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিক আলী লারিজানি।
এই ব্যক্তিরা দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা কাঠামো এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত- যা ইরানের ক্ষমতার বাস্তব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ছোট ফাটল, বড় ইঙ্গিত
এরই মধ্যে যুদ্ধের প্রভাব রাষ্ট্রযন্ত্রেও দেখা দিতে শুরু করেছে। ইউরোপে নিযুক্ত অন্তত দুইজন ইরানি কূটনীতিক দেশে ফিরে না গিয়ে আশ্রয় চেয়েছেন বলে জানা গেছে।
সংখ্যাটি ছোট হলেও রাজনৈতিকভাবে তা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ এমন একটি ব্যবস্থায় যেখানে আনুগত্যকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে দলত্যাগ অনেক সময় বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাস হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পরবর্তী নেতৃত্বের প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্ভবত দেশের ভেতরের জটিল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর মধ্য থেকেই আসবে।

