তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে চমক দেখিয়ে ১০৮ আসন জয়ের পরও সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ১০ আসন দূরে রয়েছে জনপ্রিয় অভিনেতা থালাপতি বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্ট কাজগম (টিভিকে)। তামিলনাডু বিধানসভায় আসন সংখ্যা ২৩৪। সরকার গঠনের জন্য দরকার ১১৮ টি আসন। ফলে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট গঠনে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে টিভিকে।
তামিলনাড়ুর ২৩৪টি আসনের ফলাফলে দেখা যায়, ১০৮টি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে টিভিকে। এম কে স্টালিনের নেতৃত্বাধীন দ্রাবিড় মুনেত্র কাজগম (ডিএমকে) ৫৯টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এবং এআইএডিএমকে পেয়েছে ৪৭টি আসন। এছাড়া অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে কংগ্রেস ৫টি এবং পাত্তালি মাক্কাল কাজি (পিএমকে) ৫টি আসনে জয় পেয়েছে।
জোট গঠনের বিষয়ে সূত্র জানিয়েছে, সরকার গঠনে টিভিকে-কে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক কংগ্রেস ও পিএমকে। তবে বিনিময়ে তারা প্রত্যেকে দুটি করে মন্ত্রীপদ দাবি করেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন বলছে, সরকার গঠনের লক্ষ্যে রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকারের কাছে সাক্ষাতের সময় চেয়ে আবেদন করেছে দলটি। দলের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিরা বাইরের সমর্থন পাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। তারা দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগামের (ডিএমকে) সঙ্গে বর্তমানে জোটবদ্ধ দলগুলোর সম্ভাব্য সমর্থনের দিকে ইঙ্গিত করছেন- যার মধ্যে রয়েছে কংগ্রেস, যারা পাঁচটি আসন জিতেছে, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই), ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) (সিপিআইএম) এবং বিদুত্থালাই চিরুথাইগাল কাচ্চি (ভিসিকে), যারা প্রত্যেকে দুটি করে আসন পেয়েছে।
এর আগে ২০০৬ সালের সংখ্যালঘু ডিএমকে সরকার বাইরের সমর্থনে টিকে গিয়েছিল। এমন পরিস্থিতি ডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে একটি নতুন বিন্যাস ঘটাতে পারে। বিশেষ করে কংগ্রেস, নির্বাচনের আগে টিভিকের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য জোটের কথা ভেবেছিল এবং ডিএমকের চেয়ে বেশি আসন নিশ্চিত করতে সেটিকে কাজে লাগিয়েছিল— যা জোটের মধ্যে আগে থেকেই বিদ্যমান টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
টিভিকের জন্য আরেকটি সম্ভাব্য পথ হলো পাট্টালি মাক্কাল কাচ্চির (পিএমকে) সমর্থন, যাদের পাঁচটি আসন রয়েছে। তবে অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগামের (এআইএডিএমকে) সঙ্গে কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে, কারণ দলটি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে জোটবদ্ধ, যাকে বিজয় তার আদর্শগত প্রতিপক্ষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এআইএডিএমকে এবং বিজয়ের দলের মধ্যে জোট হওয়া এখন খুবই কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, গত কয়েক মাসের তিক্ততা, প্রকাশ্য আক্রমণ এবং ভেস্তে যাওয়া আলোচনা জোটের সব পথ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৫ সালের শেষের দিকে এআইএডিএমকে এবং টিভিকের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল। কিন্তু সেই আলোচনা মুখ থুবড়ে পড়ে বিজয়ের দলের কঠোর শর্তের কারণে। এখন সরকার গঠনের জন্য টিভিকে কাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয় সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
শুরুটা হয়েছিল ২০০৯ সালে
বিজয় তার ভক্তদের একজোট করার কাজ শুরু করেছিলেন ২০০৯ সাল থেকেই। তখন তার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ফ্যান ক্লাবগুলোকে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ নামে একটি সংগঠনের পতাকাতলে নিয়ে আসেন। শুরুতে এটি শুধু সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক সংগঠন হিসেবে কাজ করত। তারা মানুষের বিপদে সাহায্য করা, শিক্ষাসামগ্রী বিলি করা এবং স্থানীয় নানা সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসার মধ্য দিয়ে একদম তৃণমূল পর্যায়ে পরিচিতি তৈরি করে ফেলে।
২০১১ সালে এই সংগঠন এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন দেয়। এর মধ্য দিয়ে বিজয় প্রথমবারের মতো সরাসরি কোনো রাজনৈতিক পক্ষে যোগ দেন। তিনি মূলত দেখতে চেয়েছিলেন, তার তারকা খ্যাতি দিয়ে ভোট টানা যায় কি না।
২০১০-এর দশকের শেষ এবং ২০২০-এর দশকের শুরুর দিকে সিনেমার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিজয়ের উপস্থিতি ও কথাবার্তায় রাজনৈতিক বার্তা থাকতে শুরু করে। ২০১৯ সালে ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন’ (সিএএ) নিয়ে তার সমালোচনা এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তিনি চলচ্চিত্রের গণ্ডির বাইরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চান।
বিজয়ের সিনেমার গান প্রকাশের অনুষ্ঠান (অডিও লঞ্চ), ভক্তদের সঙ্গে সভা এবং নানা সমাজসেবামূলক অনুষ্ঠানে পরীক্ষার চাপ, তরুণদের বেকারত্ব, দুর্নীতি ও সুশাসনের মতো বিষয়গুলো বেশি বেশি করে আলোচনা হতে থাকে। এ কথাগুলো নতুন ভোটার ও শহরের স্বপ্নবান তরুণদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।
মনের ভেতর দাগ কেটেছিল
রাজনৈতিক দল ঘোষণার আগেই তার সংগঠনের শক্তি প্রমাণিত হয়। ২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তার সংগঠনের প্রার্থীরা যেসব আসনে লড়েছিলেন, সেগুলোর বেশির ভাগেই জয়লাভ করেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে তার জনপ্রিয়তা শুধু লোক জড়ো করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি ভোট টানতেও সক্ষম।
অবশেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিজয় তার রাজনৈতিক দল টিভিকের আত্মপ্রকাশ ঘোষণা করেন। তিনি খুব পরিষ্কারভাবেই সবকিছু জানান। বিজয় বলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনে তার দল একাই লড়বে। ভোটের আগে তারা কারও সঙ্গে জোট বাঁধবে না। রাজ্যের বড় দুই দল ডিএমকে ও এআইএডিএমকের বাইরে তারা একটি পরিচ্ছন্ন বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে চায়।
দল ঘোষণার পরপরই বিজয় সিনেমার জগৎ থেকে বিদায় নেওয়ার কথা জানান। এর মধ্য দিয়ে তার তিন দশকের অভিনয়জীবনের অবসান ঘটে। এই সময়ে তিনি প্রায় ৭০টি চলচ্চিত্রে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অভিনয় থেকে সরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তার বার্তাটি ছিল নির্ভুল—এটি (রাজনীতি) কোনো শখের বিষয় নয়।
টিভিকে পরবর্তী দুই বছরে একটি সাধারণ ফ্যান ক্লাব থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। তারা জেলা কমিটি, নির্বাচনী এলাকার ইউনিট ও ভোটকেন্দ্রভিত্তিক দল গঠন করে। সেই সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমন ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির বিষয়গুলোকে তারা তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে। বিজয়কে গতানুগতিক বক্তা হিসেবে নয়, বরং মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা একজন নেতা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং খুব সুন্দরভাবে আয়োজন করা জনসভাগুলো এতে বড় ভূমিকা রাখে।
তবে এই পথচলা একেবারে মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালে কারও এলাকায় টিভিকের একটি অনুষ্ঠানে ভিড়ের মধ্যে পদদলিত হয়ে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে এটি ছিল বিজয়ের জন্য প্রথম বড় সংকট। এ ঘটনা দলের শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এ ঘটনার পর তার প্রতিক্রিয়া ছিল পরিমিত, প্রকাশ্য ও ভুল শুধরে নেওয়ার মানসিকতার প্রকাশ। তখন এটা দেখে আগেভাগেই বোঝা গিয়েছিল, ভবিষ্যতে সরকার চালানোর ক্ষেত্রে চুলচেরা বিশ্লেষণের মুখোমুখি হলে তা তিনি কীভাবে সামলাবেন। এখন পরিসংখ্যান বলছে, তার এই ঝুঁকি নেওয়াটা কাজে লেগেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন