ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যে বিজেপির অন্যতম আলোচিত নেতা ও সাবেক রাজ্য সভাপতি কে. অন্নামালাই আনুষ্ঠানিকভাবে দল থেকে বিদায় নিয়েছেন। কয়েকদিন ধরে চলা নানা জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শুক্রবার তার পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, বিজেপির জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীন অন্নামালাইয়ের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ অনুমোদন করেছেন। এর মাধ্যমে দলটির সঙ্গে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
৪১ বছর বয়সী এই নেতা পদত্যাগের আগে দিল্লিতে বিজেপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। তিনি জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীন ছাড়াও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক বি.এল. সন্তোষের সঙ্গে আলোচনা করেন। তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও মতপার্থক্যের অবসান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তার পদত্যাগ গ্রহণ করা হয়।
অন্নামালাইয়ের বিদায়ের পর তামিলনাড়ু বিজেপির বর্তমান সভাপতি নৈনার নাগেন্দ্রন বলেন, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজেপি কোনো একক নেতার ওপর নির্ভরশীল নয় এবং তার চলে যাওয়ায় দলের কার্যক্রমে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।
তবে অন্ধ্র প্রদেশ বিজেপির সভাপতি পিভিএন মাধব ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য, অন্নামালাই দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন এবং তার বিদায় বিজেপির জন্য একটি ধাক্কা। ভবিষ্যতে তিনি আবার দলে ফিরবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
গত ২ জুন লেখা পদত্যাগপত্রে অন্নামালাই উল্লেখ করেন, প্রায় দেড় বছর ধরে বিভিন্ন নীতি ও কৌশলগত বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তার মতবিরোধ চলছিল। বিশেষ করে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তার অবস্থানের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ছিল।
চিঠিতে তিনি বলেন, জাতীয় দল হিসেবে বিজেপিকে তামিল জনগণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে এবং স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে তিনি কাজ করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে সফলতাও এসেছে। কিন্তু রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তার ভাবনার সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থান মিলেনি।
অন্নামালাই জানান, দীর্ঘ চিন্তাভাবনার পরই তিনি দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে রাজনীতিতে তার যাত্রার মূল উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে বলেও মন্তব্য করেন।
দলত্যাগের পর প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি নতুন রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি জানান, তার নতুন রাজনৈতিক দল আগামী তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নেবে।
ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে এবং সেই লক্ষ্যে গঠিত দল আসন্ন নির্বাচনে জনগণের সমর্থন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
সাবেক আইপিএস কর্মকর্তা অন্নামালাই ২০২০ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। দলে যোগদানের অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি রাজ্য সহ-সভাপতির দায়িত্ব পান। পরে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তামিলনাড়ু বিজেপির সভাপতির পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।
তার নেতৃত্বে রাজ্যে বিজেপির সাংগঠনিক তৎপরতা ও ভোটের হার কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও নির্বাচনী সাফল্য আসেনি। তিনি ২০২১ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে বিজেপির সঙ্গে এআইএডিএমকের পুনরায় জোট গঠনের সিদ্ধান্তই অন্নামালাই ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। জানা যায়, তিনি রাজ্যে বিজেপির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার পক্ষে ছিলেন এবং দলকে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জোটভিত্তিক কৌশলকে প্রাধান্য দেয়।
এছাড়া রাজনৈতিক মহলে এমন আলোচনাও রয়েছে যে, এআইএডিএমকের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবেই তাকে রাজ্য সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরে তামিলনাড়ুতে বিজেপির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে পরিচিত অন্নামালাইয়ের দলত্যাগ রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

