তেহরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘খাইবার শেকান’ সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রগুলোর একটি হিসেবে আলোচনায় এসেছে। সহজে মোতায়েনযোগ্য, তুলনামূলক কম ব্যয়ে তৈরি এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতার কারণে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরান নিয়মিত এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত করতে ইরান একইসঙ্গে ভিন্ন গতিপথ ও গতির ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের সমন্বয়ে হামলা চালাচ্ছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, অধিকাংশ খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই প্রতিহত করা হয়েছে, তবুও কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আগের অনেক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি ভরার প্রয়োজন হতো। কিন্তু খাইবার শেকান কঠিন জ্বালানিচালিত হওয়ায় আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা যায়। ফলে এটি ট্রাক বা মোবাইল লঞ্চার থেকে দ্রুত উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হয়, যা উৎক্ষেপণের আগে শত্রুপক্ষের হামলার ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।
খাইবার শেকানের কিছু সংস্করণে এমন ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়েছে, যা শেষ পর্যায়ে মূল ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজস্ব গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। এতে রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দেওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইরান এখন একই লক্ষ্যবস্তুতে খাইবার শেকানের পাশাপাশি দ্রুতগতির ড্রোন এবং তুলনামূলক পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্রও একযোগে ব্যবহার করছে। এতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের হুমকির মুখে পড়ছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সাবেক প্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জোসেফ ভোটেলের মতে, ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে দ্রুত শিক্ষা নিচ্ছে এবং নতুন কৌশল প্রয়োগ করছে। তিনি বলেন, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট প্রযুক্তিতে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ এখন যুদ্ধক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের হাতে প্রায় দুই হাজার মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, যার মধ্যে খাইবার শেকানও রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে এখনো নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও সংযোজনের সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।
ইরানবিষয়ক গবেষক নিকোল গ্রাজিউস্কির মতে, তুলনামূলক কম ব্যয়ে উৎপাদন, বিভিন্ন ধরনের মোবাইল লঞ্চার থেকে উৎক্ষেপণের সক্ষমতা এবং আগের অনেক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় বেশি নির্ভুলতার কারণে খাইবার শেকান ইরানের জন্য একটি কার্যকর অস্ত্র।
ইরান এই ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করেছে। তবে হামলার ফলাফল নিয়ে দুই পক্ষের দাবি পরস্পরবিরোধী। ইসরায়েলের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের দাবি, তারা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও সরকারি স্থাপনায় সফলভাবে আঘাত হেনেছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, খাইবার শেকান তুলনামূলক কম খরচে তৈরি হলেও এটি প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, তার প্রতিটির মূল্য প্রায় ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। ফলে কম ব্যয়ের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছে তেহরান।
স্বাধীন ক্ষেপণাস্ত্র বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিঞ্জের মতে, প্রতিটি হামলার অভিজ্ঞতা থেকে ইরান নতুন তথ্য সংগ্রহ করছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষেপণাস্ত্রের কৌশল ও নির্ভুলতা আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে।
তথ্যসূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন