আফ্রিকার ছোট দেশ জিবুতি, জনসংখ্যা ১০ লাখেরও কম, নেই তেমন প্রাকৃতিক সম্পদ। তবুও ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দেশটির কৌশলগত গুরুত্বের শেষ নেই।
বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে দেশটিতে সামরিক ঘাঁটি রয়েছে পৃথিবীর শক্তিশালী ৫ দেশের। দেশগুলো হল- যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, জাপান ও ইতালি।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে জিবুতি শাসন করছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইসমাইল ওমর গুয়েলাহ। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য দেশটির কৌশলগত অবস্থানকে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। জিবুতির উপকূলে কয়েক মাইল ব্যবধানে ৫ দেশের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের নেপথ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত স্বার্থ।
আগামীকাল শুক্রবার (১০ এপ্রিল) জিবুতিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আশা করা যায়, এ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ষষ্ঠ বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন গুয়েলাহ।
বাব এল মান্দেব :
জিবুতির পাশেই রয়েছে বাব এল মান্দেব প্রণালি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হলে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় তেহরান। ফলে এডেন সাগর, লোহিত সাগর হয়ে ভারত সাগরে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজের বিকল্প রাস্তা হিসেবে আলোচনায় আসে বাব এল মান্দেব।
২০২৪ সালে এই প্রণালি দিয়ে প্রায় ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য পরিবাহিত হয়েছে, যা বৈশ্বিক মোটের প্রায় ৫ শতাংশ। যদি বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ — দুটি পথই বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে।
শুধু তেল নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ এই পথ দিয়ে হয়। চীন, ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলো থেকে ইউরোপে যাওয়া পণ্যবাহী জাহাজের বড় অংশই এই পথে চলাচল করে।
বর্তমানে হরমুজ বন্ধ থাকায় বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সৌদি আরব এখন তাদের ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে এই পথ দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়িয়েছে। এ জন্য দেশটি পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবহার করছে, যা আবকাইক তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র থেকে ইয়ানবু পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন পরিচালনা করে আরামকো।
জ্বালানি তথ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে এই পাইপলাইন দিয়ে দৈনিক গড়ে ৭ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল তেল লোহিত সাগরে পাঠানো হয়েছে। মার্চে হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর এই পরিমাণ বাড়িয়ে দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেলে নেওয়া হয়েছে, যা এর সর্বোচ্চ সক্ষমতা।
‘ভৌগোলিক অবস্থানই আমাদের প্রধান জাতীয় সম্পদ’
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালে ‘নাইন ইলেভেন’ হামলার পর ওয়াশিংটন যখন পূর্ব আফ্রিকায় ঘাঁটি করার পরিকল্পনা করে, তখন প্রথমেই আসে জিবুতির নাম। জিবুতি সিটির উপকন্ঠে ছিল ফ্রান্সের সাবেক ঘাঁটি ক্যাম্প লেমোনিয়ার। এই ঘাঁটিকেই যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকা টাস্ক ফোর্সের সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। যা আফ্রিকা মহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র স্থায়ী ঘাঁটি হিসেবে এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৪ হাজারের বেশি সেনা লেমোনিয়ার ঘাঁটিতে অবস্থান করে।
জিবুতি এক সময় ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পরও, দেশটিতে ফ্রান্সের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁখো জিবুতিকে তাদের ইন্দো প্যাসিফিক বাণিজ্য কৌশলের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০২৪ সালে ফ্রান্স দেশটির সাথে তাদের প্রতিরক্ষা চুক্তি নতুন করে নবায়ন করে।
২০০০ সালের পর, সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের উৎপাত বৃদ্ধি পেলে জাপান, ইতালি ও চীন জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি করে। এসব ঘাঁটি নিজ নিজ দেশের বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিয়োজিত রয়েছে।
এসব ঘাঁটি থেকে জিবুতি বড় অঙ্কের অর্থ আয় করে। ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বছরে দেয় ৬৫ মিলিয়ন ডলার, ফ্রান্স ৩০ মিলিয়ন এবং চীন ২০ মিলিয়ন ডলার। জাপান ও ইতালি দেয় ৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি। এছাড়া চীনের বিনিয়োগে ইথিওপিয়ার সাথে রেল যোগাযোগ এবং আধুনিক বন্দর তৈরি হওয়ায় জিবুতির অর্থনীতিতে নতুন গতি এসেছে।
উন্নয়ন ও বৈষম্য :
জিবুতির ভৌগোলিক অবস্থানগত গুরুত্বের সঙ্গে দেশটির নাগরিকদের দৈনন্দিন বাস্তবতার বড় ফারাক রয়ে গেছে। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ লোক বেকার এবং প্রতি পাঁচ জনের এক জন চরম দারিদ্র সীমায় বসবাস করেন।
দেশটির বিরোধী দলীয় নেতা দাহের আহমেদ ফারাহ অভিযোগ করেছেন, সামরিক ঘাঁটি থেকে প্রাপ্ত অর্থ যথাযথ খাতে ব্যবহার না করে তছরুপ করছেন প্রেসিডেন্ট গুয়েলাহ।
আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকার বন্দোবস্ত :
১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসেন ইসমাইল ওমর গুয়েলাহ। দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকতে ২০১০ সালে সংবিধান সংশোধন করেন তিনি। ২০২১ সালে ৯৮ শতাংশ ভোট পেয়ে পঞ্চমবারের মতো জিবুতির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন গুয়েলাহ। এর পরপরই প্রেসিডেন্ট পদের বয়সসীমা বাতিল করেন তিনি।

